আমরা কি ‘ব্ল্যাক হোল’ এর প্রকৃত ছবি দেখছি? অবশ্যই না। তাহলে আমরা কি দেখছি?

The centre of the M 87 galaxy, the first ever released image of a Black Hole

 

আমরা কি ‘ব্ল্যাক হোল’ এর প্রকৃত ছবি দেখছি? অবশ্যই না। তাহলে আমরা কি দেখছি? উত্তর জানার জন্য আমাদের ব্ল্যাক হোল সম্পর্কে একটা ধারণা তৈরি করতে হবে। যেমন,

ব্ল্যাক হোক কি?

খুবই সাদামাটা করে বললে স্পেস টাইমের জ্যামিতিতে ব্ল্যাক হোল হচ্ছে একটা ফুটো। যেখানে কিছু পতিত হলে চিরতরে হারিয়ে যায়। বলা ভালো, কি হয় সেটা আমরা বলতে পারি না।

ধরা যাক একটা টেবিল। যার উপড়ের পৃষ্টটা হচ্ছে স্পেস আর টাইমের মিসেলে তৈরি কোন এক ধরণের কাপড়ের চাদর। নিচে কোন তক্তা বা টেবিলের উপরি তল নেই।

তখন কি হবে যদি টেবিলের চাদরের ঠিক মধ্যেখানে একটা ফুটো করে দেওয়া হয়?

টেবিলের চাদরের উপরে যাই রাখা হোক না কেন সেটাই ফুটো গলে পড়ে যাবে। সেই ফুটোটাই বা এই রকম স্পেস-টাইমের জ্যামিতিক ফুটোই হচ্ছে কৃষ্ণ গহব্বর বা ব্ল্যাক হোল।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে আমাদের মহাবিশ্বে যা কিছু আছে সব স্পেস-টাইমের তৈরি চাদরের মাঝে আবদ্ধ। তবে সেটা আমাদের পরিচিত চাদর বা যে চাদরের কথা বলে উদাহরণ দেয়ার চেষ্টা করা হলো সেই চাদরের মতো না। বরং চাদরের চাইতে জেলি’র মতো দেখতে ভেবে নিলে বরং আমাদের কল্পনা করে নিতে সুবিধা হয়।

আবার পূর্বের উদাহরণে ফিরে যাই, সাথে একটু অন্য ভাবে দেখি, প্রচুর ভর যদি কোন চাদরের উপরের কোন জায়গায় Concentrate হতে থাকে তাহলে একটা সময় চাদরের সেই স্থলে একটা ছিদ্র হবে সেটাই স্বাভাবিক।

এবার একটা মার্বেল কল্পনা করে নেওয়া যাক যার আকার বেশ বড়। চাদরের উপরে বসানো, ভরের জন্য চাদরটা বেঁকে আছে। মার্বেলটার আকার যদি ভর ফিক্সড রেখে কমাতে থাকি তাহলে একটা সময় মার্বেল চাদরের যে জায়গায় থাকবে সেটা ফুটো হয়ে ছিড়েখুঁড়ে নিচে পড়ে যাবে।

চাদরটা স্পেস টাইমের চিন্তা করলে সেটার জন্যও একই কথা সত্য। সাধারণ অর্থে প্রচুর ভর যখন খুব সল্প জায়গায় Concentrate হতে থাকে তখন জায়গাটি ফুটো হয়ে যায়।

মার্বেলের জায়গায় এবার আমরা একটি নক্ষত্র বিবেচনা করতে পারি। যেটি ছিল অনেক বড় বা ভারি। নানান মিথস্ক্রিয়া ও গ্রাভিটেশনাল কারণে (বিস্তারিত জানার জন্য স্টেলার ফিজিক্স নিয়ে পড়তে হবে) আস্তে আস্তে ছোট হয়ে গিয়ে ক্ষুদ্র একটি অংশে এতো বেশি স্পেসটাইমের কার্ভেচার (চাদর বেঁকে ভেতরে চলে যাওয়ার মতল) তৈরি হয় যে এমন পর্যায়ে চলে যায় সে স্পেস টাইমের চাদরে ফুটো করে ব্ল্যাক হোল তৈরি। সেই ফুটোটা হচ্ছে নক্ষত্রের পরিনতি।

ব্ল্যাক হোল কি শুধু নক্ষত্রের পতনের কারণেই তৈরি হয়?

না। একটা ক্রিটিকাল ভেল্যু আছে। যদি একটা অঞ্চলে কোন সুনির্দিষ্ট স্থানের জন্য সুনির্দিষ্ট ভর পুঞ্জিভূত হয় তাহলেই সেটা স্পেস টাইমের ফ্যাবরিকে ফুটো বা ব্ল্যাক হোল তৈরির মতো কার্ভ তৈরি করতে পারে। যার কম হলে হবে না। ঠিক চাদরের মতোই। কোন ছোট মার্বেল ক্ষুদ্র যায়গায় বেশি ভর প্রয়োগ করলে চাদর ছিড়ে যাবে। তেমনি বেশ বড় যায়গা জুড়ে ফুটবল থাকলে সেখানে অনেক বেশি ভর থাকতে হবে ছেড়ার জন্য।

কি কি ধরণের ব্ল্যাক হোল হয় তাহলে?

তিন ধরণের ব্ল্যাক হোল হয় –

ক. স্টেলার ম্যাস ব্ল্যাক হোল। বা যে সকল ব্ল্যাক হোল নক্ষত্রের পতনের পরে তৈরি হয় সে গুলো। সাধারণত আমাদের সূর্যের 3 গুণ থেকে 100 গুণ ভরী নক্ষত্র গুলোর এই পরিনতি হয়।

খ. ইন্টারমিডিয়েট ম্যাস ব্ল্যাকহোল। 100 থেকে 10^5 গুণ ভারী ইন্টারস্টেলার ক্লাউড এই ধরণের ব্ল্যাক হোল তৈরি করতে পারে। যদিও সরাসরি কোন নিশ্চিত এভিডেন্স মেলেনি এবং এটি নিয়ে এখনো কাজ হচ্ছে।

গ. সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল। এ গুলো মূলত এক্টিভ গ্যালাক্সির নিউল্কিয়াস বা কেন্দ্রে থাকে। 10^6 থেকে 10^10 গুণ সূর্য ভরের হয়।

সাইজ বা আকার ছাড়াও আরেকটা বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় এনে ব্ল্যাক হোল সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। যেখানে দেখা যায় দুই ধরণের বৈশিষ্ট্য বহন করে ব্ল্যাকহোল গুলো। এক. নন-স্পিনিং বা অঘূর্ণায়মান ব্ল্যাক হোল। দুই. স্পিনিং বা ঘূর্ণয়মান ব্ল্যাক হোল।

ব্ল্যাক হোলের এইসব দৃশ্যমান প্রকারভেদ এবং কতো বড় বা কতো ভারী বা কিভাবে ঘুরছে সে সব নির্ধারণ করা যায় ইভেন্ট হরাইজনের ঘটনা প্রবাহ থেকে।

 

ইভেন্ট হরাইজন কি?

শুরুর উদাহরণে আবার যদি লক্ষ করি তাহলে দেখবো চাদরের মাঝে ফুটো হয়ে গেলে ফুটোর চারপাশে বেশ ঢালু থাকে। তখন যা-ই চাদরে রাখা হোক না কেন বাঁকের কারণে তা ফুটোর দিয়ে গিয়ে গড়িয়ে নিচে পড়ে যায়।

স্পেস টাইমের জ্যামিতিতে ঠিক ফুটোকে কেন্দ্র করে একটা ব্যসার্ধ টেনে দ্বিমাত্রিক বৃত্ত বা তৃমাত্রিক গোলক কল্পনা করা হয় যা শুধু স্পেস টাইমের বাঁকানো ঢাল বুঝায় তখন ওই বৃত্ত বা গোলকটি হলো – ইভেন্ট হরাইজন। বাংলায় ঘটনা দিগন্ত। যেখানে বা যে বাঁকের মাঝে পরে গেলে কারো নিস্তার নেই। সব হারিয়ে যাবে ফুটোর গহব্বরে।

আর এই স্পেস টাইমের কার্ভেচার এতোটাই কার্ভ বা শক্তিশালী যে সেখানে আলোও বেরুতে পারে না। তাই আমরা ব্ল্যাক হোলকে দেখি না। বা দেখতেও পারবো না।

 

তাহলে ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপ এর মতো প্রজেক্টে তাহলে আমরা কি দেখছি?

আমরা মূলত দেখছি ঘটনা দিগন্তকে বা ইভেন্ট হরাইজনকে। দেখছি তাড়িতচৌম্বক বিকিরণ থেকে, যা আমাদের দেখা আলো এবং না দেখা আলোর সম্বলিত রূপ।

মূলত ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপ দিয়ে আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, নাম Sagittarius A* , আমাদের থেকে প্রায় 26000 আলোকবর্ষ দূরে, যার দৃশ্যমান আকৃতি 50 microarcseconds , এই পরিমাণটা যে কতোটা ক্ষুদ্র সেটা বোঝার জন্য নিচের ছবিটা দেখা যেতে পারে। আর এই ছবি দেখেই বুঝে নেয়া যায় আমাদের পর্যবেক্ষণের ইকুয়েপমেন্ট কতোটা সফিস্টিকেটেড হতে হয়। আর তাই আমাদের পৃথিবীতে অবস্থিত অনেক গুলো টেলিস্কোপ এমন করে সিঙ্ক্রোনাইস করা হয়েছে যেন পুরো পৃথিবীটা একটা টেলিস্কোপ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। 

 

SagA*

দ্বিতীয় সবচাইতে গুরুত্বর সাথে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে M87 গ্যালাক্সির কেন্দ্রে।  যা আমাদের থেকে প্রায় 54 মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে। প্রচণ্ড ভারী। 20-40  microarcseconds আকৃতির এবং ইভেন্ট হরাইজন থেকে আমরা দেখি জেট ছুটে আসতে। ব্ল্যাক হোলের চারদিকে অতি একটিভ মিথস্ক্রিয়ার জন্য এমনটা হয়। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে এইটা বেশ ইন্টারেস্টিং টপিক। আমরা কনফিডেন্টলি জানি ওইখানের অনেক ফিজিক্স আমরা জানি না বা কখনো দেখিও নি। তাই ওইটা নিয়ে বেশি মনোযোগ না দিলে হয়ই না।

M87

ইভেন্ট হরাইজনের সিমুলেশন ও সরাসরি চিত্র

আমাদের একটা জিনিস মনে রাখতে হবে, টেলিস্কোপিক বা যান্ত্রিক প্রযুক্তি ডেভলপ হবার আগেই আমরা তাত্বিক ভাবে ব্ল্যাক হোল সম্পর্কে অন্যে বেশি তথ্য জেনে ফেলেছি। সেই তথ্যর উপরে ভিত্তি করে সিমুলেশন করে আমরা Sagittarius A*  ও  M87 এর কেন্দ্রের ইভেন্ট হরাইজনের কিছু ছবিও তৈরি করে ফেলেছি। ছবি গুলো আর ছবি তৈরির প্রক্রিয়া গুলো জানার জন্য মূল গবেষণা পত্রতে চোখ বুলাতে হবে। যেমন: Mościbrodzka, M., Falcke, H., & Shiokawa, H. (2016). General relativistic magnetohydrodynamical simulations of the jet in M 87. Astronomy & Astrophysics, 586, A38.  

Simulated images for SagA*

Simulated images for M87

আমরা যদি সিমুলেশন করা ছবি গুলোর দিকে তাকাই তাহলে দেখব চার দিকে একটা রাউন্ড কালারফুল শেড। এই আলোক ছটাকে বলা হয় প্রোটন রিং। পেছনের অন্যান্য নক্ষত্র ও আলোক উৎস থেকে যখন আলো আসে তখন গ্র্যাভিটেশনের কারণে বেঁকে গিয়েছে আমাদের দিকে ছুটে আসছে বলে আমরা দেখতে পারছি। আর মাঝের গোল অংশটার পেছনের কিছু আসতে পারছে না। পুরোটাই শোষিত হয়ে যাচ্ছে ব্ল্যাক হোল দ্বারা। এখানে প্রোটন রিং এর সাথে এক্রিয়েশন ডিস্ক এর একটি পাতলা আস্তরণ আছে। যা হয়তো আলাদা করে বোঝা যাচ্ছে না।

EHT Reconstruction বলতে বুঝাচ্ছে ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপে যেমনটা দেখা যাবে তা, ওইটাও আমরা সিমুলেশন থেকে বের করে ফেলেছি। 

মজার ব্যপার হচ্ছে অবজার্ভড ইমেজে প্রায় একই রকম আমাদের সিমুলেশনের সাথে তুলনা করলে। এই থেকে হয়তো বলতে পারি আমাদের সিমুলেশন আর সরাসরি দেখা হয়তো প্রায় একই হতে যাচ্ছে ভবিষ্যতে।

আর এটা হচ্ছে M87 এর ছবি যা শুধু মাত্রও সিমুলেশন করে তৈরি করা ছবি নয়, বরং রিকন্সট্রাক্ট করে তৈরি করা হয়েছে। আর কি ভাবে সেটা করে? সেটা হয়তো আমরা পরে কোন সময়ে আলোচনা করবো।

Real Image of M87


ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপ থেকে পাওয়া ছবিটার একটা ব্যখ্যা হয়তো এখানে পাওয়া যাবে।


 

Leave a Reply

Close Menu