ভয়

 

মাত্র সন্ধ্যা। অন্ধকার হচ্ছে। রফিক বাড়ি ফিরছে। গ্রামের পাকা রাস্তাটা কদিন আগের বর্ষায় ভেংগে গিয়েছে বলে এই বাড়ির ওই বাড়ির উঠোন এই বাড়ির পিছোন তো ওই বাড়ির সামোন উপর দিয়ে সবাই চলাচল করছে। গ্রামের বাড়ি গুলো একটা থেকে আরেকটা খুব দূরেও না আবার কাছেও না। পাশে প্রায় সব বাড়িরই বাগান ধাচের ছোট ক্ষেত। সাজানো বাড়ি। সাজানো গ্রাম।
আজ আকাশে চাঁদ নেই তবে তারা উঠছে। চারদিকের আবহাওয়া চমৎকার। মৃদু বাতাস। স্নিগ্ধ আমেজ।

রমিজের মা’র কন্ঠ শোনা যাচ্ছে। সবাই বলে রমিজ মারা যাবার পরে রমিজের মা পাগল প্রায়। রমিজের জন্মর এক বছরের মাথায় রমিজের বাবা নিরুদ্দেশ হয়। কোথায় আছে কি করছে কেও জানে না। আর রমিজটাও মারা গেলো তার এক বছর পর। বছর দুই বয়সে।

নিজের ছনের বাসায় একা থাকে রমিজের মা। গলার আওয়াজে একটু কৌতুহল হলো।
একটু এগিয়ে দেখলো দূরে কুপি জ্বালানো। দরজা খোলা। এমন দূর থেকে আলো আধারিতে দেখা যাচ্ছে না কিন্তু বোঝা যাচ্ছে কেও কোলে, ছোট বাচ্চা মতো কেও। কিন্তু আবার কেউ না। কালো একটুকরো জমাট ধোঁয়া যেন দলা পাকিয়ে আছে।

একটা বাচ্চা কন্ঠ শোনা গেলো। বেশ মৃদু আর খসখসে।
‘ঘুমামু না।’
‘কেন রে!’
‘ডর লাগে।’
রমিজের মা একটু হাসলো। ‘কিয়ের ডর রে?’
‘ভূতের’।
‘ধুর। ভূত কি ডরের জিনিস নাকি। না ডর নাই।’
‘ক্যান মা!’
‘যাগো মানুষের শরীর আছে ওগোই ভূতের ডর লাগে। আর যাগো শরীর নাই তাগো আবার কিয়ের ডর!’

রফিকের মনে হলো রমিজের মা ঝুকে যেন বাচ্চার কপালে ঠিক মা’দের মতো করে চুমু দিলো বাচ্চা ঘুমপাড়ানোর আগে যেভাবে সব মায়েরা চুমু দেয় তাদের বাচ্চাদের কপালে। বাচ্চার যায়গাটার দিকে আবার চোখ গেলো, মনে হচ্ছে দলা পাকানো ধোঁয়া যেন পাঁক দিচ্ছে বাতাসে। আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে।

মিয়াঁও!

একটা বিড়াল। কি করে যেন রফিকের গা ছুয়ে যাওয়ার চিৎকার দিয়ে ছুটে পালালো।

রফিক ঘারড়ে গিয়ে চিৎকার দিলো। গলা দিয়ে স্পষ্ট কোন শব্দ বের হলো না। ভীত, মৃদু ও অস্পষ্ট হাঁসফাঁস আওয়াজ বের হলো।

‘কে ওইখানে’? রমিজের মায়ের গলা। এগিয়ে আসছে রফিকের দিকে বাসা থেকে বের হয়ে। হাতে কুপি। রমিজের মা’কে দেখে রফিকের অন্তরাত্মা শুঁকিয়ে গেলো। রমিজের মা’র চোখ জ্বলছে। সাদা আগুনে চোখ। কোন শ্বপদের চোখে আলোপরলে যেমন জ্বলজ্বল করে তেমন চোখ। যে চোখ মানুষের হতে পারে না।

কোন মতে জবাব দিলো, ‘আমি……মোল্লা বাড়ির রফিক!’
‘কি করেন ওইখানে?’
‘কিছু না রমিজের মা। বাড়ির দিকে যাইতেছি।’
‘বাড়িত যান রফিক ভাই। রাইত বিরাইতে জংলা রাস্তায় বেশি সময় নষ্ট কইরেন না! আন্ধার হইয়া গ্যাছে। নানান কিছু হইবার পারে।’, বলেই রমিজের মা ঘুরে বাড়ির দিকে কুপি হাতে পেছন ফিরে হাঁটা ধরলো। যেন কোন জড় উদ্ভিদ যন্ত্রর মতো করে হেটে চলে যাচ্ছে।

রফিকের মনে হলো ও নিজেই কেমন যেন গোঙ্গানির মতো আওয়াজ করছে। ঘামছে। গা দিয়ে পানি পরছে। কপালে ফোটা ফোটা ঘাম।

নিজেকে খুব দুর্বল মনে হলো।

বিভ্রান্ত হয়ে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইলো যতক্ষন না রমিজের মা তার ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয় ভেতর থেকে।

দরজা বন্ধ করার সাথে সাথে রফিক টলে উঠলো একটু। তারপর পাগলের মতো বাড়ির দিকে ছুট দিলো উদ্ভ্রান্ত হয়ে।

Story by 

Ahmed Sanny

Leave a Reply

Close Menu