হোমো নালেডি: নতুন করে খুঁজে পাওয়া “প্রায় মানুষ”দের কথা

২০১৩ সালে সাউথ আফ্রিকার Raising Star Cave System নামক গুহার শ্রেণির গভীরের আবিষ্কৃত হয় কিছু ফসিল হয়ে যাওয়া দেহাবশেষ। সেখানে ছিলো পনের’শর অধিক খণ্ডবিখণ্ড ফসিল। এক সাথে এতোগুলো ফসিল খণ্ড এর আগে আফ্রিকার কোন একটি নির্দিষ্ট স্থানে তার পূর্বে পাওয়া যায় নি। বলে রাখা দরকার, সাধারণ অর্থে ফসিল হচ্ছে সুদূর অতীতের প্রাণীদের দেহাবশেষ যা প্রাকৃতিক ভাবেই সংরক্ষিত । আরেকটু ভালো করে বললে, প্রাচীন কালে মারা যাওয়া কোন প্রাণীর দেহাবশেষ বা দেহাবশেষের সুস্পষ্ট চিহ্ন যদি মাটিতে মিশে না গিয়ে কোন না কোন ভাবে সংরক্ষিত হয়ে থাকে তাহলে তাই হলো ফসিল। নানাবিধ ভৌগলিক ও রাসায়নিক কারণে সব প্রাণী যেমন মাটিতে মিশে যায় মাটিতে তেমনি দুর্লভ কিছু কারণে ফসিল হয়ে ওঠে। তাই হুট হাট করে আমরা ফসিল পাই না। ফসিল প্রাপ্তি খুবই দুর্লভ একটি বিষয়।

“রাইজিং স্টার কেভ সিস্টেম থেকে পাওয়া হোমো নালেডির ফসিল ও নৃতাত্বিক গবেষক দল”

তো যারা ওই ফসিল গুলো আবিষ্কার করেন সাউথ আফ্রিকাতে তারা একটি গবেষণা দলের সদস্য যার নেতৃত্বে ছিলেন প্রফেসর লী বার্জার (Lee Berger)। তিনি একজন নৃতত্ত্ববিদ (Anthropologist)। কাজ করেন জোহানসবার্গের একটি বিশ্ববিদ্যালয়য়ে, নাম University of Witwatersrand।

নতুন ফসিলগুলো আবিষ্কারের পর বার্জার ও তার বিশেষজ্ঞ দলের সবাই দেখলো এগুলো Ape প্রজাতির। এপ হচ্ছে বানর শিম্পাঞ্জী মানুষ আকৃতির প্রাণীদের সাধারণ নাম। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে এই নতুন পাওয়া ফসিলগুলো মিলিয়ে যা পাওয়া গেলো সেটা চেনা পরিচিত কোন এপ এর মতো না। ভিন্ন কিছু। এবং সম্পূর্ণ নতুন কিছু। তারা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে লাগলো ফসিল গুলো নিয়ে। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে eLife নামক বৈজ্ঞানিক জার্নালে তাদের আবিষ্কার করা ফসিল সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করলো। (যে কেউ চাইলে গবেষণা পত্রটি পড়ে দেখতে পারেন এখান থেকে, https://elifesciences.org/content/4/e09560)।

সেই প্রকাশিত ফলাফল থেকে আমরা সর্বপ্রথম জানতে পারলাম অতীতে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া মানুষের খুবই নিকটবর্তী আরেকটি আদি এপ সম্পর্কে। যার নামকরণ করা হলো , হোমো নালেডি (Homo Naledi)।

“ড. লী বার্জার, সাথে হোমো নালেডি’র রেপ্লিকা”

দৈহিক আকৃতিতে মানুষের চাইতে হোমো নালেডি বেশ ছোট। বর্তমান মানুষ তথা হোম স্যাপিয়েন্সদের মতোই এর হাত রয়েছে আর রয়েছে পা। যা খুবই সাদৃশ্যপূর্ণ। কোমর আর কাঁধের হাড় অস্ট্রোলোপিথেকাস (Australopithecus) নামের আরেক শ্রেণীর এপের মতো। এই এপ গোত্রটিও পৃথিবীতে আর টিকে নেই। যার সম্পর্ক আবার মানুষের চাইতে শিম্পাঞ্জির সাথে বেশি। ওদিকে হোমো নালেডির মাথার খুলির আকৃতি লক্ষ করলে কিন্তু আরেকটি মজার জিনিস দেখা যায়। মস্তিষ্কের আকৃতি শিম্পাঞ্জীর চাইতে সামান্য একটু বড়। কিন্তু গড়ন আমাদের মানুষদের তথা হোমো স্যাপিয়েন্সদের মতো। বিশেষত মস্তিষ্কর যে অংশ দিয়ে আমরা ভাষা ব্যাবহার করি সেই অংশ একইরকম বলা যায়।তারপর দন্ত বিন্যাসও খুবই সাদৃশ্যপূর্ণ। যদিও মানুষের চাইতে আকৃতিতে অবশ্যই ছোট অনেক। তাই অনেকে ধারণা করছে হোমো নালেডিরা হয়তো ভাষার ব্যাবহার জানতো। তবে ব্যাপারটা স্পষ্ট নয় এবং এমন সিদ্ধান্তে আসাও উচিত নয়। কারণ নিশ্চিত হবার জন্য আরও অনেক পরীক্ষানিরীক্ষার প্রয়োজন। আর সেটা নিয়ে কাজ হচ্ছেও। পৃথিবীর নানা প্রান্তের বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরা একযোগে এটা নিয়ে কাজ করছে। যেমন কঙ্কাল তন্ত্র গবেষক নিউ ইয়র্কের স্টোনি ব্রোক ইউনিভারসিটির উইলিয়াম য্যানযেরস জানিয়েছে তার গবেষণা থেকে হমো নেলেডির  উচ্চতা ১.৪ মিটারের মতো হতো গড়পড়তায়। ওজন হতো চল্লিশ কেজির মতো।

“হোমো নালেডি সহ অন্যান্য এপদের পৃথিবীতে বিচরণকালীন সময় সীমা আর শ্রেনীবিন্যাস এই ছবিটা থেকে ধারণা করা যেতে পারে।”

ওদিকে সাম্প্রতিক গত ২০১৭ সালের মে মাসেই eLife জার্নালে হোমো নালেডি সংক্রান্ত আরেকটি গবেষণা ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। (মূল গবেষণা পত্রটি পড়ার জন্য : https://elifesciences.org/content/6/e24231) যেখানে আইসোটোপ এনাইলাইসিস করে বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে হোমো নালেডির। তাতে দেখা যায় দুই লাখ ছত্রিশ হাজার বছর থেকে তিন লাখ পঁয়ত্রিশ হাজার বছরের সম সাময়িক সময়ে হোমো নালেডি অস্তিত্বশীল ছিলো। এই আবিষ্কারটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ এর অর্থ হচ্ছে আধুনিক মানুষ যে সময় আফ্রিকায় বিচরণ করতো সেই সমসাময়িক কালের হচ্ছে এই হোমো নালেডি। যদিও এমন কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি যা থেকে মানুষের মতো বা প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলো কিনা বিবর্তনের ধারায় তা বুঝা যায়। তারা পাথরের বা আগুনের ব্যাবহারও জানতো নাকি সেটা সম্পর্কেও জানা যায় না। যেহেতু মানুষের সমসাময়িক আর যদি আগুন পাথরের ব্যাবহার তারা জানতো তাহলে নিঃসন্দেহে তারা ছিলো মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী। তবে যাই হোক না কেন, কোন কারণে তারা প্রকৃতিতে টিকে থাকার প্রতিযোগিতায় সফল হয় নি, হয়েছে মানুষ। আবার মানুষের টিকে থাকার পেছনে হোমো নালেডির বিলুপ্তির কোন প্রভাব আছে কি-না, অথবা এই দুই প্রজাতির মধ্যে মিশ্রণ ঘটেছিলো কি-না, ইত্যাদি প্রশ্নত্তোর এবং তাদের পেছনের কারণ গুলো খুঁজে বের করার মতো রোমাঞ্চকর কাজ করে যাচ্ছেন বিশেষজ্ঞগণ প্রতিনিয়ত। আমরাও তাদের গবেষণার সিদ্ধান্ত থেকে আস্তে ধীরে জানতে পারবো বিজ্ঞ মহলে ‘প্রায় মানুষ’ (Almost Human) বলে পরিচিত হোমো নালেডিরা কতটুকু মানুষ ছিলো। আর সে সব জানার জন্য অপেক্ষা করতে হবে এবং প্রতিনিয়ত চোখ রাখতে হবে হোমো নালেডির উপর সাম্প্রতিক প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধ গুলোর উপরে।

“হোমো নালেডির কাল্পনিক ছবি। হাড়ের অবস্থান বিবেচনা করে সম্ভাব্যতার মাধ্যমে কম্পিউটার সিমুলেশন করে তৈরি করা হয়েছে।”

______

This article was published on NEON-ALOY.

Written by 

Ahmed Sanny

Leave a Reply

Close Menu