সৌম্যর চেতনা

১.

দেশের একটি শীর্ষ স্থানীয় দৈনিক পত্রিকার শেষ পৃষ্ঠায় ছবি সহ একটি মৃত্যু সংবাদ ছাপানো হয়েছে। ছবির নিচে কয়েকটা লাইন এই রকম “পুলিশের প্রাথমিক তদন্তর পরিপ্রেক্ষিতে বলা হয়েছে গতকাল রাতে সৌম্য রহমান নামক এক ব্যাক্তি তার অফিসের বেতন নিয়ে বাসায় ফিরছিল। আসার সময় কোন ছিনতাইকারী দলের সম্মুখে পড়ে। বাকি অংশ পৃ-৫, ক- ২”।

২.

– সৌম্য।

– হ্যাঁ।

– তোমাকে স্বাগত।

– আমি কোথায় !

– যেখানে তুমি এসেছ।

– কোথায়?

– সর্বত্র।

– মানে?

– তুমি এখন আর মানবদেহে আবদ্ধ নও। জানো?

– জানি। কিন্তু তাহলে আমি কি?

– তুমি চেতনা।

– চেতনা! কীভাবে? আপনি কে?

– তুমি আমি সব এক। আমাদের অনুভূতিই হচ্ছে আমাদের চেতনা।

– বুঝিনি। আপনাকে দেখতে পাচ্ছি না কেন? চারদিকে কিছু নেই। কোন আলো নেই। কোন আঁধার নেই। কিছু নেই।

– দেখতে পাবে না। তুমি আছো আমার ভেতরে। আমিও তোমার ভেতরে। মিশে আছি। আরো অনেকেই আছে।

– আরো অনেকে! ……তারা কই?

– এইতো, আমি-ই তারা। আমি-ই সবাই।

– মানে?

– আমরা সবাই এক হয়ে গিয়েছি।

– আমিও কি তেমনটাই হবো?

– হ্যাঁ। আস্তে আস্তে হবে। সবাই এক হয়ে যায়।

– বুঝিনি। আমার তো মৃত্যু হয়েছিল।

– হ্যাঁ। তুমি মৃত। তোমার কোন জৈবিক অস্তিত্ব নেই। মনে আছে কিভাবে মারা গিয়েছিলে?

– হ্যাঁ। ছিনতাইকারীর হাতে। অফিস থেকে হাজার বিশেক টাকা নিয়ে ফিরছিলাম। প্রচণ্ড রাগ লেগেছিল আমার কষ্টের টাকা নিতে চাইছিল বলে।

– তারপর?

– এক জনের হাতে ছুড়ি দেখে ভয় করছিল। বাসা পরিবারের কথা মনে পরছিল বারবার।… অদ্ভুত! এখন কিছু লাগছে না। কোন অনুভূতি কাজ করছে না। দুঃখ, ক্ষোভ, আনন্দ, ভালোবাসা বা ভয়। কোনটাই না। 

– ওই সব অনুভূতি কাজ করবে না।

– কেন?

–  দুঃখ কষ্ট, আনন্দ উচ্ছ্বাস, ভালোলাগা ভালোবাসা, রাগ ঘৃণা, ভয় এই সব জৈবিক ব্যাপার। মস্তিষ্কের বিভিন্ন ধরনের মিথস্ক্রিয়ার ফলাফল। তোমাকে ওই সব আর স্পর্শ করবে না।

– কেন?

– কারণ তোমার কোন জৈবিক অস্তিত্ব নেই। তাই।

– তাহলে আমি কি? কে আমি?

– ওই যে বলেছিলাম। তুমি তোমার চেতনা। আমি বা আমরাও তাই।

– আমি তো জানতাম মৃত্যুর পর স্বর্গ বা নরক থাকে। আমি সেখানে নই কেন?

– কোথাও কিছু থাকে না, শুধু চেতনা ছাড়া। মৃত্যুর পর সব চেতনা এক হয়ে যায়।

– আমি, আমার মা, আমার স্ত্রী। সবাই এক। অথবা ওই ছিনতাইকারী?

– হ্যাঁ। সবাই এক। সবার একই সত্তা। জীবিত অবস্থায় শুধু ভিন্ন ভিন্ন সত্তায় বিভক্ত হয়ে থাকে।

– মৃত্যুর পরে কি তাহলে এক হয়ে যায়?

– হ্যাঁ।

– আগে?

– আগেও এক থাকে। পরে আলাদা আলাদা হয়ে জৈবিক অস্তিত্ব ধারণ করে খানিকটা সময়ের জন্য বিচরণ করে। মৃত্যুর পর আবার এক হয়ে যায়।

– বুঝার চেষ্টা করছি। কঠিন লাগছে। আরেকটু পরিষ্কার করে বলা যাবে?

– না, যাবে না। অপেক্ষা করো। ধীরে ধীরে বুঝে যাবে।

– আচ্ছা, আমি যখন আধো ঘুমে থাকতাম আমার স্ত্রী-আমার প্রেয়সী আমার মাথায় হাত রেখে এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকতো। আমি বুঝতে পারতাম অদ্ভুত ধরনের এক প্রশান্তি কাজ করতো তখন। নিজেকে অনেক পরিপূর্ণ লাগতো। ওটা তো কোন জৈবিক অনুভূতি ছিল না।

– এইতো ধরতে পেরেছ। তখন তোমাদের দুই জনের চেতনা মিলে এক ধরনের স্বয়ংসম্পূর্ণতা পেত। তাই।

– এখন আমার কি হবে?

– কিছু না। আমরা এক হয়ে যাবো। যেমন’টা বলেছিলাম।

– আমার বৃদ্ধা মা, আমার স্ত্রী?

– হ্যাঁ ওরাও হবে। মৃত্যুর পর। চেতনা হয়ে আমাদের সাথে মিলে যাবে। থাকবে শুধু – ‘এক আমি’।

– ‘এক আমি’?

– তুমি আমি সবাই এক। সবার এক চেতনা। এক স্বত্বা। তাই সবাই মিলে ‘এক আমি’।

– অন্যান্য পশু পাখি, গাছ গাছড়া বা অন্য কোন জীব?

– ওরাও আমি। আমিই ওরা।

– মানে?

– অপেক্ষা করো। বুঝে যাবে।

– তাহলে আমি বা আমাদের বাইরে কি আছে?

– কিছু না। সবই এই চেতনারই অংশ। একই সত্তার অংশ। এর বাহির বলে কিছু নেই। ভেতর বলেও কিছু নেই। সবটাই তুমি আমি সবাই মিলে – এক আমি।

– তারপরে?

– তারপরে বা আগে বলে কিছু নেই। কোন সময় নেই। শুধু ‘এক আমি’ ছাড়া।

. 

খানিক বাদে সৌম্য’র আলাদা কোন অস্তিত্ব রইলো না। অথবা সৌম্যর অস্তিত্বই শুধু টিকে রইলো।  

 

*গল্পটি সায়েন্স ফিকশন গ্রন্থ পেন্টাকল্প’তে প্রকাশিত

Leave a Reply

Close Menu