প্লাতোনোভ

এক.

আমি পৃথিবী নামক গ্রহটির শেষ পরিপূর্ণ জৈবিক মস্তিষ্কের মানুষ। হ্যাঁ, শেষ জৈবিক মস্তিষ্কের অধিকারী মানুষ। ওরা আমাকে ওদের মতো করে ফেলতে চেয়েছিল। আমি রাজি হই-নি। আমি বলেছিলাম, ‘আমার মস্তিষ্ক স্ক্যান করে ধাতব কোন ডিভাইসে প্রতিস্থাপন করবো না’। তারা বলেছিল, ‘ধাতব মস্তিষ্ক আর জৈবিক মস্তিষ্কর মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। উল্টো সুবিধার কথা চিন্তা করলে এটা অনেক এগিয়ে। জৈবিক মস্তিষ্কর আয়ু আছে। একটা নির্দিষ্ট সময় পর স্থবিরতা আসে। অকেজো হয়ে পরে। এই অকেজো হবার আবার কোন সুস্পষ্ট বয়স সীমা নেই। অন্যদিকে যারা মস্তিষ্কে ল্যাবে তৈরি চিপ-ডিভাইস ব্যাবহার করছে তাদের মাঝে সেই সীমাবদ্ধতা নেই। অনেক কায়দা কসরত করে ধংশ করা যায়। কিন্তু তারপরেও কোন সমস্যা নেই। মূল তথ্য কেন্দ্রে প্রত্যেক মস্তিষ্কর জন্য আলাদা-আলাদা ডাটাবেস তৈরি করা আছে। নিয়মিত আপডেট করা হয়। কোন কারণে কোন ধ্বংস হয়ে গেলেও সংরক্ষিত তথ্য চিপের মাধ্যমে নতুন কোন জৈবিক দেহের বা ক্লোনের মস্তিষ্কে লাগিয়ে নতুন করে যে কাউকেই ফিরে পাওয়া যায়’। তারা ওই রূপান্তরিত মস্তিষ্কর নাম দিয়েছে ‘প্লাতোনোভ’। যে কোন জৈবিক মস্তিষ্কর চাইতে প্লাতোনোভ অনেক বেশি ডাটা প্রসেস করতে পারে। সিদ্ধান্ত নিতে পারে প্রায় দিগুণ গতিতে। এভাবে আমাকে অনেক বুঝানো হয়েছে আমি কিছুতেই রাজি হইনি। যারা আমার মতো প্রথমে বাধা দিয়েছে পরে তাদের ধরে নিয়ে প্লাতোনোভ করে ফেলা হয়েছে। আমাকে ধরতে পারেনি। আমি মূল তথ্যকেন্দ্রে ডাটাবেস নিয়ে কাজ করতাম। আমার জীবনের সেরা কাজটি হলো – মূল তথ্যকেন্দ্রে একটা ভুল তথ্য ঢুকিয়ে দিয়েছি। সেটা হচ্ছে আমি প্লাতোনোভড। যাদের মস্তিষ্ককে প্লাতোনোভে রূপান্তর করা হয় তাদের প্লাতোনোভড বলে। এই মিথ্যা তথ্য এন্ট্রি করার সময় ধরা পরলে সরাসরি আমাকে আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে খুন করা হতো। প্রাচীন কালে ধর্ম অবমাননা করলে যেমন সবার মাথায় খুন চেপে বসতো এখনো তেমনটা ঘটে। তবে সেটা যদি হয় তথ্যকেন্দ্র সংক্রান্ত কোন বিষয়।     

তার উপরে প্লাতোনোভ কি চিন্তা করছে না করছে সব সরাসরি চলে যায় মূল তথ্য কেন্দ্রে। কারো মনে কোন খারাপ বা নিয়ম বহির্ভূত চিন্তাভাবনা আসলে সঙ্গে সঙ্গে তার প্লাতোনোভের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়া হয়। এটা কেও জানে না। হয়তো জানে। আমি ঠিক বলতে পারছি না। তবে ব্যপারটা তথ্য কেন্দ্র থেকে জানানো হয় না, এ বিষয়ে নিশ্চিত। কিন্তু আমি জানি। প্রমাণ করা খুব কঠিন নয়। কিন্তু কেউ লক্ষ করে নি, হয়তো প্লাতোনোভ মস্তিষ্ক সেটা করতে দেয় নি। স্বাভাবিক মানব প্রজাতিতে অনেক কিছুই আছে যাদের কখনো সম্পূর্ণ ভাবে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা যায় না। যেমন সবাই প্লাতোনোভড হবার পরে কোন অপরাধের সংবাদ আমি দেখি নি। কোথাও না কোথাও কোন না কোন অপরাধ সংগঠিত হতেই হবে, সম্পূর্ণ না হওয়া অস্বাভাবিক। এবং এই অস্বাভাবিক ব্যপারটাই আমি প্রতিদিন লক্ষ করছি। পৃথিবীর শেষ মানুষটি প্লাতোনোভড হয়ে যাওয়ার পরে যান্ত্রিক গোলযোগ ছাড়া মানবিক ভুলের কোন এক্সিডেন্টের খবর আমি কোথাও পাই নি। কোন মানুষ ভুল করে ভুল কারো প্রেমে পড়েনি। কোথায় মানুষদের মধ্যে ঝগড়া হতে দেখি নি। কেও ভুল খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়নি। শিশুদের শিশুসুলভ বাচ্চামী করতে দেখা যায়নি। তারা ছোটো বেলা থেকেই যেন বড় মানুষ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। নিজস্ব গণ্ডীর বাইরে কাওকে কখনো কৌতূহলী হতে দেখা যায় নি। সব কিছু নিয়মতান্ত্রিক। সব কিছু সুশৃঙ্খল সাজানো গছানো, পরিপাটি।  

মানুষদের কী এমনটা হওয়া উচিত? উত্তর আমার জানা নেই। আমার মনে হয় – না, এমনটা হওয়া উচিত। সব নিয়ন্ত্রিত হলে মানুষের মানুষ হওয়া দরকারটা কি ছিল!

দুই.

আমি এখন আমার একটি ছোটো ফ্লাটে থাকি। অনেকটা আত্মগোপন করে থাকার মতো করে। জানি না কতদিন আমার ঢুকানো ভুল তথ্য আমাকে রক্ষা করতে পারবে। যে কোন দিন সেন্ট্রালের কম্পেয়ারেবল চেকিং সিস্টেমে ধরা পরতে পারে। আশঙ্কা করি। অনিশ্চয়তায় দিন কাটাই। ধরা পরলে হয় আমাকে প্লাতোনোভড করে ফেলা হবে নয়তো খুন করা হবে।

তবে একটা জিনিস আমার কাছে পরিষ্কার, প্লাতোনোভড নামের মানুষ গুলোকে সুশৃঙ্খল রোবটের মতো ব্যবহার করে পরিচালনা করছে সেন্ট্রালাইজড প্লাতোনোভ সিস্টেম। যে সিস্টেমকে অনেক আগে মানুষরা বলতো আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স।

 

*গল্পটি সায়েন্স ফিকশন গ্রন্থ পেন্টাকল্প’তে প্রকাশিত                

Leave a Reply

Close Menu