অদৃশ্য ঘাতক

 

 

১.

ড. রমিজ উদ্দিন তার মোটা ফ্রেমের চশমার ভেতর দিয়ে সামনে বসা লোকটার দিকে তাকিয়ে আছে। তার কাছে কাউন্সেলিং এর জন্য এই মানুষটা যে আসতে পারে সেটা কল্পনাতেও আসেনি। মানুষটাকে আরেকবার ভালো করে দেখলেন। উচু নাক। তার মতোই কালো মোটা ফ্রেমের চশমা পড়া। গায়ে হাফ হাতা সাদা একটা সার্ট। চুল কোঁকড়ান ও ঝাঁকড়া চুলের অধিকারী। না ঘুমানোর জন্য চোখ গুলো লালচে হয়ে আছে। কয়েকদিনের শেভ না করা চেহারা। সব ধরণের বাহুল্য বিবর্জিত একজন মানুষ। এইত এটাই উনার পরিচিত স্বাভাবিক গেট-আপ। বইয়ের ফ্লাপ আর টেলিভিশনে উনাকে ঠিক এমনটাই দেখায়।

ইনি পাভেল খান। খুব বিখ্যাত লেখক। বয়স পঁয়ত্রিশ। বয়সের তুলনায় তুমুল জনপ্রিয়। বৃদ্ধ তরুণ শিশু সবাই তার লেখার ভক্ত। থ্রিলার আর অ্যাডভেঞ্চার ধাঁচের খুব বিখ্যাত কিছু উপন্যাস আছে উনার। কয়েকটি ড. রমিজ ইসমাইল নিজেও পড়েছে। প্রতিটির সাসপেন্স অসাধারণ। বিশ্লেষণ বিজ্ঞান নির্ভর আর প্রচণ্ড যুক্তির ছড়াছড়ি। লেখা পড়েই ধারণা করা যায় পাভেল যুক্তিবাদী মানুষ। কঠিন যুক্তি ছাড়া কোন কিছু মেনে নেবার মতো না। কিন্তু মজার বিষয় আজ পাভেল খান তার কাছে এসেছেন এমন এক সমস্যা নিয়ে যার কুল কিনারা পাভেল খান করতে পারছে না। সমস্যাটার সমাধান করতে হবে লজিক দিয়ে। কিন্তু কোন লজিক পাওয়া যাচ্ছে না – পাভেলের তাই মনে হয়েছে আর এই মুহুর্তে ড. রমিজেরও তাই মনে হচ্ছে।

ড. রমিজ ইমাইল নিচু গলায় হালকা কাশি দিয়ে বলল, ‘পাভেল সাহেব। ঘটনাটা আবার বলুনতো।’

‘ঘটনা দুটো। এক. আমার স্ত্রী অদ্ভুত কিছু একটা দেখে যেটা ও’ কে খুন করতে চায়। দুই. কোন কারণ ছাড়াই ওর হাতে কাঁটা দাগ।’

‘জি। তারপর -‘

‘গতকাল রাত একটার দিকের ঘটনা। আমি তখন লিখছি। নতুন একটি উপন্যাস নিয়ে ব্যাস্ত। স্পর্শী, মানে আমার স্ত্রী বিছানায় ঘুমোচ্ছিলো। লেখার টেবিলের পাশেই বিছানা। লেখায় বেশ ডুবে ছিলাম। অন্য কোন কিছুতে লক্ষ্য ছিল না। হঠাৎ খেয়াল হল স্পর্শী আমাকে জাপটে ধরে চিৎকার করছে। তারপর বেহুঁশ হয়ে নিচে পড়ে গেলো। হাতে একটা কাঁটা দাগ। ছুড়ির ফলা দিয়ে হাঁতে একটা ক্রস আঁকা। অনেক তীক্ষ্ণ তবে গভীর নয়, হালকা রক্ত ঝড়ছিল। আমি তখন ফোনে এ্যাম্বুলেন্স ডেকে ছুটলাম ওকে নিয়ে হাঁসপাতালে।’ পাভেল একটু থেমে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে যোগ করলো, ‘হাঁসপাতালে যাবার পর কিছু ক্ষণের জন্য জ্ঞান ফিরেছিল। খানিক বাদেই উত্তেজিত হয়ে আবার জ্ঞান হারায়’।

ড. রমিজ হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এখন বাজে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা। মানে এই এক্সিডেন্টটি ঘটেছিল প্রায় উনিশ ঘণ্টা আগে। আপনার স্ত্রীর জ্ঞান ফিরেছিল কখন?’

‘দুটার দিকে। কড়া ঘুমের ওষুধ দিয়ে ঘুম পারিয়ে রাখা হয়েছিল। তাই অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছে।’

‘ডাক্তার কি বলেছে?’

‘ডাক্তার তো বলল সব ঠিক আছে। দ্বিতীয়বার জ্ঞান হারিয়েছে হাইপারটেনশনের জন্য। চিন্তার কোন কারণ নেই। হাতের কাঁটাতে ওষুধ লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। গুরুতর কিছু নয়। যদিও আমি মনে করেছিলাম বিষাক্ত কিছু কি-না? ডাক্তার রক্ত টেস্ট করে জানিয়েছে কোন বিষাক্ত কিছুও পাওয়া যায় নাই। হাসপাতালে যাওয়ার পর ইমিডিয়েট রক্ত পরীক্ষা করা হয়েছিলো।’

‘আচ্ছ আবার বলুন তো, আপনার স্ত্রী কী দেখেছিলো? দুপুরের ঘটনাটা বলুন। উত্তেজিত হয়ে গিয়ে কী করেছিল?’

‘আজ দুপুরে জ্ঞান ফেরার পর আমি স্পর্শীর পাশে ছিলাম। কিছু আত্মীয় স্বজন চলে এসেছিল। ঘুমুচ্ছিলো বলে কাওকে ঢুকতে দেয়া হয়নি ওর কেবিনে। একমাত্র আমি ছাড়া। রাত থেকে কিছু খাওয়া বা ঘুম কোনটাই হয়নি। একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। হঠাৎ স্পর্শীর কণ্ঠ – পাভেল, পাভেল। ও আমাকে মেরে ফেলতে চায়। আমি চমকে ওর দিকে তাইয়ে বললাম, কে? স্পর্শী এবার বলল – কালো মুখোশ পড়া লোকটা। হাতে ছোড়া। কাল রাতে তুমি যখন লিখছ তখন লোকটা এসেছিল। টকটকে লাল চোখ। জাপানি সামুরাই অ্যাসাসিনদের মতো কালো কাপড়ে মুখ ঢাকা। এই টুকু বলার পরেই আমার পেছনে চেয়ে চিৎকার করে উঠলো – ওই তো! এখানে চলে এসেছে। আমাকে খুন করবে। এই বলেই আবার জ্ঞান হারাল।’


‘সাদামাটা চোখে দেখলে পুরো ঘটনাটা কিন্তু অতি চিন্তার ফসল হিসেবে দেখানো যায়। আর ঘুমের ঘোড়ে হাত কেটেছে কোন ভাবে। সেটা থেকেই দেখতে পারছে এমন, সাথে বাস্তব ইমপ্যাক্ট তৈরি করে ফেলেছেন তার কল্পনার। এটা এক ধরণের হেলুসিনেশন। উনি কি অনেক মুভি টুভি দেখে? আর বয়স কত উনার?’

‘না তেমনটা নয়।……টিভি দেখেই না বলতে গেলে। বয়স আমার থেকে পাঁচ বছরের ছোটো। ত্রিশ। আর আমিও তাই ভেবেছিলাম। কোন ধরণের হেলুসিনেশন হবে হয়তো! কিন্তু আরও অদ্ভুত ব্যাপার আছে। কেবিনে জ্ঞান হারানোর পর মেঝেতে দেখেছিলাম এক জোড়া পায়ের ছাপ ঠিক আমার পেছনে। খালি পা এর ছাপ ছিল ও গুলো। তাছাড়া বাসায় কোন তীক্ষ্ণ ধারালো ছুড়িই নেই যা দিয়ে অমন করে হাত কাঁটা যায়। যেভাবে কেটেছে সেভাবে কাটতে হলে ধারালো ছুড়ির প্রয়োজন। তারপর ঘুমের ওষুধের প্রভাবে স্পর্শী অনেকক্ষণ ঘুমুবে বলে বিকেলে হাসপাতাল থেকে বাসায় গিয়েছিলাম। বাসায় ওই হাঁসপাতালে দেখা পায়ের ছাপের মতো এক জোড়া ছাপ চোখে পরে। ঠিক আমার বেড রুমের বিছানার পাশেই। এইটাই সব চাইতে অবাক করেছে।’

‘পুলিশকে জানিয়েছেন’?

‘না। জানাই-নি। ব্যাপারটা মানসিক, পুলিশি না। তাছাড়া পুলিশ জানালে সাংবাদিক আর সাংবাদিক জানা মানে সারাদেশ খবর রটানো। অনলাইন-অফলাইন দুই মাধ্যমে অতি প্রতিক্রিয়াশীল সংবাদ মাধ্যম থাকলে যা হয় আরকি। ঘন্টাখানেকের মাঝেই এক গাদা নিউজ চলে আসবে, হেড লাইন আর্টিকেল – বিশিষ্ট লেখকের স্ত্রী মানসিক রোগী। তারপর একটা সময় দেখা যাবে এক গাদা ভুং ভাং সত্য মিথ্যা মিশ্রণে গাল গল্প হাবিজাবি।’

‘বুঝতে পেরেছি। বিখ্যাত মানুষদের যা হয়। খ্যাতির বিড়ম্বনা’।

‘এটা বিড়ম্বনা নয়। অত্যাচার। তবে আমি অতো খ্যাতিমান নই।’

‘আহা, বিনয়ের দরকার নেই। সেটা আমরা ভালোই জানি। যে মানুষ ত্রিশ হতেই জাতীয় সাহিত্য পুরষ্কার পান। তাকে বিখ্যাত বা খ্যাতিমান বলা যাবে না বললেই হবে নাকি? আচ্ছা এবার বলুন আমি কি ভাবে সাহায্য করতে পারি আপনাকে। আপনার সমস্যা তো শুনলাম।’

‘সেটাই তো বুঝতে পারছি না। আপনি একজন সাইকিয়াটিস্ট। কাজ করেন ইনভেস্টিগেশন সম্পর্কিত প্যারা সাইকোলজি নিয়ে। অনলাইনে আপনার একটা ব্লগ পরেছিলাম। আপনার কাজ আর ইন্টারেস্ট সম্পর্কে ধারণা পেয়েছি। আর রোগী আমি নই, আমার স্ত্রী। তার ছোড়া হাতের গুপ্তঘাতক সমস্যাটা সমাধান মনে হল আপনি করতে পারবেন। তাই আপনার শরণাপন্ন হওয়া।’

প্রসঙ্গ পাল্টে ড. রমিজ চমৎকৃত কণ্ঠে জিজ্ঞাস করলো, ‘আপনি আমার ব্লগ পরেন?’

‘মাঝে মধ্যে। লেখালেখি নিয়ে থাকি, সব বিষয়েই কৌতূহল তাই ইন্টারেস্টিং কিছু পেলে পড়া তো লাগেই’।

‘হা হা। যা বলেছেন। ঠিক আছে। এখন তো আমার কাউন্সেলিং করার সময় শেষ। বাসায় ফিরবো। চুলুন যাওয়ার পথে আপনার স্ত্রীর সাথে দেখা করে যাই। আমার বাসায় যাওয়ার পথেই উনার হাসপাতাল পড়বে। আপনার স্ত্রীর সাথে একটু কথা বলা যাবে। এতো এতক্ষণে হয়তো তার জ্ঞান চলে এসেছে।’

‘আচ্ছা চলুন। শুধু একটা বিষয়। ও’কে বলবেন না যে আপনি সাইকিয়াট্রিস্ট। আপনি সিমপ্লি ইনভেস্টিগেটর। ইনভেস্টিগেট করতে এসেছেন শুধু এটা বললেই চলবে। সাইকিয়াট্রিস্ট বললে ক্ষেপে উঠতে পারে। বলে বসবে আমি ওকে পাগল ঠাওরাচ্ছি। মেয়েদের টেম্পারমেন্ট যা। কখন কিসে ক্ষেপে যায় কোন ঠিক নেই। তাছাড়া জগৎ সামলানোর চাইতে বউ সামলানো সহস্র গুণ বেশি কঠিন’। একটু রসিকতা করে বলল পাভেল। ড. রমিজ কোথার শেষ অংশ শুনে হেসে ফেললো, ‘তা যা বলেছেন। আমি নিজেও টের পাই। চলুন বেড়িয়ে পড়ি’।

 

২.

পাভেল তার স্ত্রী স্পর্শীর মাথার কাছটায় বসে আছে। ড. রমিজ দাঁড়িয়ে আছে। রুম নার্স জানিয়েছে স্পর্শীর জ্ঞান ফিরেছে অনেকক্ষণ। কোন সমস্যা হয়নি। সুপ দেয়া হয়েছিলো। খেয়েছে। প্রেশার স্বাভাবিক। আত্মীয় স্বজন যারা এসছিল তাঁরা চলে গিয়েছে।

‘স্পর্শী দেখো উনি ড. রমিজ। আমার পরিচিত। উনি হচ্ছেন–’

পাভেল খানের কথা শেষ না করতে দিয়ে ড. রমিজ বলল, ‘ভাবী, আমি একজন ইনভেস্টিগেটর। পাভেল সাহেবের কাছে আপনার ঘটনাটা শুনেছি। আপনাকে সুস্থ দেখেকে ভালো লাগছে। এখন কেমন লাগছে?’

‘একটু দুর্বল কিন্তু ঠিক আছি।’, স্পর্শী স্বাভাবিক কণ্ঠে জানালো।

‘কথা বলতে সমস্যা হচ্ছে’?

‘নাহ। ঠিক আছি। কোন সমস্যা হচ্ছে না’।

‘আমাকে কি একটু বলবেন গত রাতে কী ঘটেছিল’?

স্পর্শী ঠিক ততটুকুই বলল যা ড. রমিজ পাভেলের কাছ থেকে শুনেছিলো। একটু এদিক ওদিক হলো না। তারপর স্পর্শীর কাঁটা ক্ষত দেখে ধন্যবাদ জানিয়ে পাভেল কে নিয়ে করিডোরের দিকে চলে আসলো।

‘দেখুন বিষয়টা পরিষ্কার হচ্ছে না। সোজা সাপ্টা ধারণাটাই বেশি গ্রহণ যোগ্য মনে হচ্ছে। আপনার স্ত্রী কোন ভাবে ভয় পেয়েছে সাথে হাত কেটেছে কোন না কোন এক ভাবে। প্রচণ্ড ভয় পাবার জন্য এমন ভুলে গিয়েছে বা গড়বড় পাকিয়ে ফেলেছে কীভাবে কেটেছে সেটা নিয়ে। আর মেঝেতে পায়ের দাগটা নিতান্তই কাকতালীয়। কত ভাবেই তো পায়ের ছাপ পড়তে পারে। বিশেষ করে হাসপাতালে। তাছাড়া বাসায় অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে যারা গিয়েছিল তাদের কারো হতে পারে। তবে বাসারটা কিভাবে পরেছে সেটা একটু খতিয়ে দেখতে হবে। চোর টোর নয় তো আপনারা হাসপাতালে আসার পরে বাসায় গিয়েছিলো বা কৌতূহলি কেউ। অথবা হতে পারে এম্বুলেন্সে করে যারা আপনার স্ত্রীকে আনতে গিয়েছিল তাদের কেউ যে বাসায় এবং হাসপাতালে দুই যায়গাতেই জুতো খানিকটা সময়ের জন্য খুলেছিল। অনেকেই তো স্যান্ডেল পরা থাকে। সাবধানে কাজ করার জন্য খালি পা হয়। যদিও হাসপাতালের আইনে পেশেন্ট সামলানর জন্য খালি পা হওয়া সিরিয়াস রকমের নিশেধাজ্ঞা আছে। তারপরেও তো হতে পারে। ‘

‘হুম, তা ঠিক। কিন্তু তারপরেও কেমন যেন একটা খটকা লাগছে। মনে হচ্ছে কিছু একটা হচ্ছে। ঠিক ধরতে পারছি না।’

পাভেল খাঁ কথা শেষ করতে কোরতেই তীক্ষ্ণ চিৎকার ভেসে আসলো স্পর্শীর কেবিন থেকে। স্পর্শীর চিৎকার। পাভেল আর ড. রমিজ দুইজনে ছুটে রুমে ঢুকলো। স্পর্শী বেহুঁশ। বিছানায় নেতিয়ে আছে। এইবার অন্য হাতে ধারালো কিছু দিয়ে ক্রস আঁকা। অগভীর ক্ষত। কিন্তু হালকা রক্ত লেগে আছে।

পাভেল স্পর্শীর অবস্থা দেখেই ছুটলো ডাক্তার ডাকতে।

ড. রমিজ দেখল বিছানার পাশে মেঝেতে প্রমাণ সাইজের পায়ের ছাপ।

এক জোড়া খালি পা।


৩.

রাত এগারোটা। কাল থেকে রাত জাগা। খানিক আগের ছুটোছুটিতে ক্লান্ত পাভেল খান। ড. রমিজ ইসমাইল পাভেলের পাশে। বাসায় যায়নি। কাল কন্সাল্টেন্সি বন্ধ। তার উপরে উনার স্ত্রী দুই ছেলে মেয়ে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছে। রাতে বাড়ি ফেরার তাঁরা নেই। স্ত্রী ফোন দিয়ে একবার জিজ্ঞাস করেছিলো – কোথায়? রমিজ জানিয়েছে পেশেন্টের সাথে আছে। নতুন একটা এসাইনমেন্ট। ড. রমিজের নিত্য নতুন এসাইনমেন্টের প্রতি বরাবরের মতো এক ধরণের আসক্তি রয়েছে। তাই তার স্ত্রী আর কথা বাড়ায় নি। সাবধানে থাকার কথা বলে ফোন ছেড়েছে।
ড. রমিজ আর পাভেল দুই জনে এখন একটা রেস্টুরেন্টে বসা । ড. রমিজের ভ্রু কুঁচকে রয়েছে।

‘কি ভাবছেন ড. রমিজ সাহেব?’

‘কি ঘটছে কিছু ধরতে পারছি না।’

পাভেল খান কোন জবাব দিলো না। লক্ষ্য করলো ড. রমিজের দৃষ্টিতে এক ধরণের শূন্যতা। যেন অকুল পাথারে হাবুডুবু খাচ্ছে।

‘পাভেল সাহেব।’

‘জি। বলুন।’

‘একটা জিনিস লক্ষ্য করেছেন?’

‘কি?’

‘আপনি যখন উপস্থিত বা আসেপাসে থাকেন তখন কেবল স্পর্শী মানে আপনার স্ত্রীর উপরে আক্রমণ হচ্ছে।’

‘না। কি বলছেন? … আচ্ছা। আপনি ঠিক বলেছেন।’

‘আপনি লেখক। যুক্তিবাদী মানুষ। অনুসন্ধানীও বটে। লেখক মানেই অনুসন্ধানী। আর আমি তো সরাসরি পেশাদার অনুসন্ধানী। তাই না?’

‘হুম। কিন্তু এসব বলছেন কেন?’

‘সেটাই তো কথা। কি বলতে চাচ্ছি না? কেন বলতে চাচ্ছি? হেঁয়ালির মতো লাগছে আমার কথা আমার কাছেই। কিছু মনে করবেন না। আসলে কিছু একটা বের করতে চাচ্ছি। আচ্ছা আপনার বাসায় কি যাওয়া যাবে। একটু দেখতে চাচ্ছি। আপনার স্ত্রী তো নিরাপদে আছে। এক জন সার্বক্ষণিক নার্স রাখা হয়েছে কেবিনে। চিন্তা নেই। আর আমার মনে হয় হাসপাতাল থেকে মানে আপনার স্ত্রী থেকে যতটা সম্ভব দূরেই থাকুন।’

একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে মাথা ঝাঁকালও পাভেল খান। আসলে তো কিছু করার নেই। খেয়াল করলে যে কেউ লক্ষ্য করবে ড. রমিজ ইসমাইলের কোথা ঠিক। সে আশপাশে থাকলেই স্পর্শী আক্রমণের শিকার হচ্ছে। খানিকটা ভারাক্রান্ত গলায় বলল, ‘চলুন তাইলে। বাসায় যাই’।


৪.

বাসায় গিয়ে ড. রমিজ ইসমাইল ভালো করে চারপাশ দেখলো। বিশেষ করে বেড রুমটা। কোন কিছু যদি পাওয়া যায়! কিছু পাওয়া গেলো না। অন্তত চোখে পড়ার মতো কিছু পাওয়া গেলো না। সব খতিয়ে দেখতে দেখতে রাত তিনটা। অনেক রাত বলে পাভেল খানে অনুরোধে তার বাসায় থেকে গেল। বাসা খালি ছিল। আছে শুধু পাভেল আর ড. রমিজ। তাই কোন সমস্যাই হবার কথা নয়। আসার সময় দুজনেই বাইরে থেকে খেয়ে এসেছে।
ড. রমিজের সাথে কথা বলতে বলতে ক্লান্ত ঘুমহীন পাভেল ছাড়া শরীরে সোফাতেই ছেড়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। ড. পুরো বাড়ি ঘুরে পায়চারী করতে লাগলো। তার ঘুম আসবে না। ডায়নিং রুমে পায়চারী করতে করতে বেড রুমে পাভেলের লেখার টেবিলটা দেখা যায়। উপরে পরে আছে একটা মোটা বড় বাঁধানো খাতা। পাশে বেশ কিছু কলম। দেখেই বুঝা যায় এটাই পাভেল খানের লেখার যায়গা। খাতাটাতেই নতুন উপন্যাস লিখা হচ্ছে।

আনমনে ড. রমিজ খাতাটা নিয়ে পড়া শুরু করলো।


৫.

পরদিন সন্ধ্যা।

ড. রমিজ ইসমাইলের চেম্বারে বসে আছে পাভেল। স্পর্শীর কাছে যায়নি আজ সারাদিন পাভেল খান। ফোনে কথা বলেছে। সুস্থ আছে। পাভেলকে সারাদিন ড. রমিজ নিজ পাশে রেখেছে। ওকে নিয়ে ঘুরেছেন এলো মেলো ভাবে। চেম্বার বন্ধ তারপরেও সন্ধ্যার আগ দিয়ে পাভেলকে নিয়ে চেম্বারে এসেছেন।

অনেক এলো মেলো গল্প গুজব করার পরে কথা শুরু করলো ড. রমিজ –

‘কাল আপনি ঘুমোনর পরে আমি ঘুমাইনি। কি ঘটছে সেটা ধরার অনেক চেষ্টা করেছি। পাই নি। আমি জানি না এখন ঠিক বলছি কিনা। তারপরেও আসুন আপনি আর আপনার স্ত্রীর মাঝে ঘটে যাওয়া ঘটনার একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করি। তার আগে বলে নেই, আপনার মতো এমন আরেকটা ঘটনার কথা শুনেছিলাম আমার বিদেশি এক সাইকোলজিস্ট বন্ধুর কাছে। তার নাম ফ্রেড হেনরিক। ড. ফ্রেড। আমরা এক সাথে পিএইচডি করেছিলাম ইউনিভার্সিটি অফ এডিনবার্গে। বন্ধুটি ছিল সুইডিস। সে বলেছিল সে অনেক ছোটো বেলায় কোন এক পাগলাটে লোককে তার এলাকায় দেখতো। রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো পাগল। প্রতিদিন কারো না কারো বাড়ির সামনে রাতে ঘুমাত। কোন বাড়ির বাসিন্দা দয়া দেখিয়ে নিজ বাড়িতে রাখতে চাইলেও সে বাড়িতে থাকতো না। রাস্তায় রাস্তাতেই থাকতো। এমনই কোন সমস্যা ছিল না পাগলের। তবে মাঝে সাঁঝে রাতে পাগলের কান্না আর হেল্প হেল্প চিৎকারে আর্তনাদ শোনা যেতো। পরদিন দেখা যেতো পাগলের গায়ে কোন না কোন ক্ষত বা জখম। অনেকেই রাতে চিৎকার শুনে পাগলকে দেখে আসতো কেউ মারছে নাকি। কিন্তু কাউকে কখনো দেখা যায়নি পগলের আশেপাশে। চিৎকারের সময় বলতো তাকে মারার জন্য মৃত সৈন্যরা ছুটে আসছে, বেয়নেট দিয়ে আঘাত করছে। পাগলটি আগে সৈন্য ছিল। জার্মানদের হয়ে যুদ্ধ করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে জার্মানরা মিত্র বাহিনীর হাতে টিকবে না বুঝতে পেরে পালিয়ে নিজ দেশ সুইডেনে চলে আসে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তার হাতে মরেছিল অনেক মানুষ। তারপর একটা সময় পাগল হয়ে যায়। লোকে তাই পাগল হয়ে যাওয়া আর অদ্ভুত জখমের ঘটনাকে বলত অভিশাপ। যারা ওর হাতে মারা পরেছে সব হচ্ছে তাদের অভিশাপ।

তবে নাম না জানা সুইডিস পাগলের ঘটনাটার একটা ব্যখ্যা ড. ফ্রেড। তার ধারণা লোকটি সমগ্র ব্যাপারটাই কল্পনা করে নিতো। ধারণা করতো তাকে বেয়োনেট দিয়ে কেউ আঘাত করছে। আঘাতটি আসলে কেউ করে নি। করেছে তার মস্তিষ্ক। কিন্তু কোন এক ভাবে সেই তথ্যটা যেখানে আঘাত করতো সেখানে পৌঁছে দিত। আর সেটা করেই ক্ষান্ত হতো না। আঘাতে যেমন করে কেটে ক্ষত যেত ঠিক সেই ভাবে ক্ষতও তৈরি করে ফেলতো। কল্পনা শক্তি শুধু কল্পনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, বাস্তবে পরিণতির দিকে নিয়ে যায় না কাউকে। কিন্তু তার ক্ষেত্রে প্রবল কল্পনা শক্তি বাস্তবতার সাথে গুলিয়ে এইভাবে প্রকাশ ঘতাটাতো।

যা হোক বিষয়টি নিয়ে ড. ফ্রেড কোন পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে পারেনি। ওই পাগলটা হঠাৎ করে ওদের এলাকা ছেড়ে চলে যায়। কোথায় যায় কেউ বলতে পারেনি। তাছাড়া তখন ফ্রেড অনেক ছোটো। গিয়ে কথা বলবে এক অভিশপ্ত পাগলের সাথে সে সাহস ছিল না।

আমার ধারণা আপনাদের ক্ষেত্রেও তেমটা হচ্ছে।

গতরাতে আপনি ঘুমিয়ে যাবার পরে আমি পায়চারী করছিলাম। খোলা দরজা দিয়ে আপনার পাণ্ডুলিপিটা দেখে নিয়ে পড়া শুরু করলাম। অসম্পূর্ণ লেখা। বোঝা যায় মাঝ পথেই লেখা থামিয়ে দিয়েছেন। আপনার অর্ধসমাপ্ত পাণ্ডুলিপিটা এক খুনিকে নিয়ে লেখা। সে প্রাচীন জাপানী অ্যাসাসিনদের মতো ড্রেস পড়ে মানুষ খুন করে। কিন্তু সামুরাই অ্যাসাসিনদের মতো কোন রাজনৈতিক গুপ্ত খুন করতো না, তার খুনের শিকার শুধু নারী। পুরুষদের নিয়ে তার মাথা ব্যাথা নেই। সহজ করে বললে সে একজন লেডি কিলার। ঠিক সোভিয়েত ইউনিয়ন থাকা কালীন রাশিয়ার সিরিয়াল কিলার ‘রেড রিপার’ এর মতো। যে শুধু নারীদের হত্যা করতো। যতদূর শোনা যায় রেড রিপার জীবদ্দশায় বাহান্ন’জন নারী খুন করেছিল।
ঠিক বলতে পারছি না কি হয়েছিল তবে আপনার পান্ডুলিপি নিয়ে হয়তো কথা বলার ছলে কোন এক ভাবে নারীদের খুন কড়া গুপ্ত ঘাতকের বিষয়টি আপনার স্ত্রী স্পর্শীর মাথায় ঢুকে গিয়েছে। আর স্পর্শী ঠিক সেটা নিয়েই কল্পনা করছে। আর ব্যাপারটা হচ্ছে যখন আপনি ওর আশপাশে থাকেন ঠিক তখন। দূরে থাকলে ওই কল্পনা কাজ করে না। যেমন কাল যে কয়বার ওই মুখোশ ধারীকে দেখেছে ততবার আপনি ওর আশপাসে ছিলেন। আজ সারাদিনে দেখে নি। আপনি ওর পাশে নাই। যদি হাঁসপাতালে আজকে যান তবে আবার দেখবে। চাইলেই আপনি গিয়ে পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। আপনার কাছ থেকে ওই কল্পনা অস্তিত্বশীল হয়েছে তাই আপনি ওর সাথে কোন না কোন ভাবে জড়িয়ে গিয়েছেন। ড. ফ্রেডের কাল্পনিক ব্যাখ্যা থেকে আপনার ঘটনার ব্যখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা। এটা ছাড়া আর কোন ব্যাখ্যা নেই আমার কাছে। পায়ের ছাপের ব্যখ্যাটা আমার কাছে নেই। কল্পনা শক্তি কখনো এতো প্রখর হতে পারে না যে সেটা বস্তুজগতের কোন ধরণের পরিবর্তন আনতে পারে। এখন ঠিক বলতে পারছি না কি করে আপনার স্ত্রী ভালো থাকবে। তবে একটা পরামর্শ দিতে পারি, আপনারা দুই জন বরং বাইরে কোথাও একটা ট্যুর দিয়ে আসুন। স্পর্শীর মেন্টাল ডিসঅর্ডার বিষয়টা হয় তো নতুন পরিবেশে একটু অন্য ভাবে কাজ করবে। হয়তো ডিজওর্ডার ব্যপারটা থাকবেই না, সুস্থ হয়ে উঠবে। আর যদি সুস্থ না হয় তাহলে আপাতত দূরে থাকুন। আপনার প্রভাবে স্পর্শী আরও অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। একটা সময় কোন না কোন উপায় আমরা বেড় করে ফেলতে পারবো। সময় যেতে দিন। আর একটা বিষয় উনার আশপাশে যেন পরবর্তী কয়েকটা দিন কেউ না কেউ অবশ্যই থাকে। উনাকে একা রাখা যাবে না।’


৬.

বিখ্যাত লেখক পাভেল খান ড. রমিজ ইসমাইলের চেম্বার থেকে বের হয়ে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় অদ্ভুত ছায়াময় লাগছে চারপাশ। হাঁটতে হাঁটতে পকেটে হাত দিলো। বের করে আনলো হাত। একটা কলম। কলমটা ছুড়ে ফেলে ফেলার জন্য হাত উচু করলো। কিন্তু তারপর কি মনে করে যেন পকেটে রেখে দিলো। বাড়ির দিকের সোজা পথ ছেড়ে ডান দিকে মহাসড়কের ফুটপাথ ধরে এগিয়ে চলল। গাড়ি ড. রমিজের চেম্বারের পারকিং লটে রেখে এসেছে। থাকুক ওখানে। আজ বাড়ি ফিরবে না পাভেল।

 

*গল্পটি সায়েন্স ফিকশন গ্রন্থ পেন্টাকল্প’তে প্রকাশিত  

Leave a Reply

Close Menu