কক্ষবন্দী

১.

ফোনের ডিসপ্লের দিকে তাকিয়ে আছে আসিফ ইমরান, ঠোঁট কেঁপে কেঁপে উঠছে। ফোনের স্ক্রিনে শাফিরা নূরের হাসিমুখের ছবি। মনে হচ্ছে আলতো করে মাথা সামনের দিকে এনে চশমার উপর দিয়ে তাকিয়ে আছে ইমরানের দিকে। ছবি জুড়ে শুধু শাফিরার মুখ। এই মুখটার দিকে তাকালে ইমরানের ভেতরে এক ধরণের হাহাকার তৈরি হয়। মসৃণ ঠোঁটের দিকে তাকালে অজান্তেই নিজের ঠোঁট কেঁপে কেঁপে ওঠে। ঠিক যেন স্পর্শ পাবার জন্য উদগ্রিব হয়ে রয়েছে। জৈবিক আকর্ষণ মনে করতে পারে ব্যাপারটাকে কিন্তু ইমরানের চোখের দিকে তাকালে ধারণাটায় তালগোল পাকিয়ে যাবে। দুই চোখের কোণে থাকে তখন ফোঁটা ফোঁটা নোনা লবণাক্ত জল। পরিচিত জনেরা জানে এটা পছন্দের মানুষটাকে হারিয়ে ফেলার জল।

আসিফ ইমরান আর শাফিরা নূরের সংসার ছিল বছর দুইয়ের। সোশ্যাল এক কমিউনিটিতে প্রথম পরিচয়। প্রেম। তারপর বিয়ে। সব যেন হুট করেই হয়ে যায়। শুরুতে একজন অন্য জনের সব কিছুতে মুগ্ধ হয়ে হয়ে থাকতো। প্রতিটি সংগতি বা অসংগতিপুর্ণ আচরণ সব কিছুই ছিল মুগ্ধ হবার। তখন এ জুটিকে যারাই দেখেছে তাদেরই মনে হয়েছে এরা একজন অন্যজনের পরিপূরক। তারপরে আস্তে আস্তে তৈরি হলো তিক্ততা।

দুজনের বাস্তব জীবনের চলার পথের ব্যর্থতা গুলোর জন্য একে অন্যকে দায়ী করা শুরু করলো। চলতে লাগলো পারস্পারিক দোষারোপ আর সাংসারিক সমস্যা। এতে যা হবার তাই হল। সফলতা তো এলো না বরং নিজেদের দোষারোপ আর খুত অনুসন্ধানে পরিবারের বাইরের ক্যারিয়ার ও কর্ম জীবনে হতে লাগলো এলোমেলো। সফলতা হতে লাগলো দুষ্প্রাপ্য।

একটা সময় যে বিষয় গুলো ছিল মুগ্ধ হবার প্রধান উপাদান, সেগুলো হয়ে উঠলো অসহনীয়। দুজনের মধ্যকার ছোটো ছোটো ঘটনা গুলোর বিক্ষুব্ধতার টেনে বড় করার ব্যাপ্তি বৃদ্ধি প্রকট হোল এমনই যে হাস্যরস দিয়ে বললে – সমস্যা গুলো তিল থেকে তাল না হয়ে কাঁঠালের মতো বিরাট আঁকার ধারণ করা শুরু করলো। প্রতিনিয়ত তিল থেকে তাল বানিয়ে চেঁচামেচি চললে অসহনীয়কর হয়। তিল পরিমাণ কিছু টেনে হেঁচড়ে সহ্য করে হজম করা যায়। কিন্তু তিলের বদলে সব কিছু কাঁঠাল হয়ে পড়লে হজম হয় না, অসহ্যকর বদ হজমের পর্যায়ে চলে যায়। দউই জনের ক্ষেত্রে তাই হল।

তারপর আসিফ ইমরান আর শাফিরা নূর দুজনেই সিদ্ধান্ত নিলো আলাদা থাকার। সমির একা মানুষ ছিল। একা শহরের প্রান্তে একটি ফ্লাট নিয়ে বসবাস শুরু করলো। শাফিনা ফিরে গেল ওর মা, বাবা, ভাই-বোনের সংসারে। দুজনেই ডুবে গেলো যার যার পেশাগত কর্ম জীবনে।
মজার ব্যপার আট মাস আগে এমন করে আলাদা হয়েছিলো দুজনে। কিন্তু কোন এক অজানা পিছুটানের জন্য আবার একসাথে হয়েছিল মাস খানেকের মধ্য। কিন্তু লাভ হয় নি। দিন পনেরোর মধ্যে সব আকর্ষণের পরিণতি সেই তিক্ততাতেই রূপান্তরিত হয়েছে। সেই জন্য দুই মাসের মাঝে সিরিয়াসলি আলাদা হয়ে গেল। এখনো সেই অজ্ঞাত পিছুটান ইমরান অনুভব করে। এটা স্পষ্ট শাফিরার মধ্যেও সেটা কাজ করছে। কিন্তু তাই বলে এখন আর মনে হয় না তাদের এক হওয়া উচিৎ। কারণ এক হওয়া মানেই কিছুদিনের ভেতরে একে অন্যর উপরে শত্রুর মতো ঝাপিয়ে পরা। এটা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। পরীক্ষিত সত্য।

আসিফ ইমরান সাইড বাটনে হালকা চাপ দিয়ে ফোনের স্ক্রিন অফ করে দিলো। ফোনটা পকেটে ভরে টেবিল থেকে ক্যামারাটা নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে পড়লো। মন মেজাজ ভালো না থাকলে ছবি তুলার মাঝে ডুবে থাকার চেষ্টা করা আর-কি। পুরনো অভ্যাস। যদিও এটার জন্য শাফিরার সাথে কম ঝামেলা হয়নি। প্রথম অভিযোগ ছিল সমির শাফিনার বদলে ক্যামেরাকে বেশি সময় দেয়। দিন রাত এটা নিয়ে যুক্তি পাল্টা যুক্তি চলত। এর মধ্য ইমরান হুট করে চাকরি হারায়। মন মেজাজ বিখিপ্ত। ক্যামেরা নিয়ে তাই সপ্তাহে দুই একবার বের হতো। শাফিরার কাছে এটা আরও অসহ্য মনে হতে লাগলো। পরিচিত অপরিচিত জনদের কাছে বলে বেড়াতে লাগলো চাকরি বাকরির ধান্দা বাদ দিয়ে আলসেমির জীবন বেঁছে নিয়েছে ইমরান। বউয়ের টাকায় চলার ধান্দাবাজি। তাই ক্যামেরা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু কিছুতেই বুঝানো গেলো না আগে যেমন রোজ রোজ বের হতো প্রফেশনাল লাইফে বা শাফিনার সাথে সম্পর্ক শুরুর দিকে সে গুলোর কিছুই করছে না ইমরান। যা করছে সেটা নিছক অভ্যাস আর শখের বসে অথবা খুব বেশি বিক্ষিপ্ত হয়ে থাকা থেকে রিক্রিয়েশন পাবার জন্য সাথে অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল শাফিরা হয়তো কোন ছবি দেখে বলবে – ছবিটা পছন্দ হয়েছে। শুধু একটা বাক্য। ইমরান যা পারে তাই করে খুশি করতে চেয়েছিল শাফিরা’কে। কিন্তু ওই যে – পরস্পরের প্রতি পারস্পারিক বিশ্রদ্ধা চলে এসেছে। কথার আক্রমণ আর ইমরানের নিজের ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভে প্রায়ই ফেটে পড়া শুরু করলো। শোনাতে লাগলো শাফিরা একমাত্র কারণ তার সকল অশান্তির। কর্ম বা ব্যাক্তি, দুই জীবনই অতিস্ত করে ফেলছে শাফিরা।

যাক, একসাথে যেহেতু আর থাকা হয়নি তাহলে এখন আর সে সব নিয়ে ভাবার মানে হয় না।

সমির মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফ্লাটের দরজা বন্ধ করে লিফটের গ্রাউন্ড ফ্লোর বাটনে চাপ দিলো।


২.

বিকেলের পর থেকে রাস্তায় ঘুরোঘুরি করে অনেক গুলো ছবি তুলেছে ইমরান। এখন রাত। সব ছবি মন মতো হয়েছে এমন না। দু একটা যে ভাবে চেয়েছে তেমনটা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু এখনি বলা যাচ্ছে না। বাসায় ফিরে কম্পিউটার স্ক্রিনে না দেখা পর্যন্ত শান্তি পাওয়া যাবে না।

ইমরান বাসায় ফিরছে। সামনে গলিমত জায়গা। মেইন রোডের পাশে। ভেতরে চায়ের দোকান আছে একটা। মেইন রোড থেকে ইমরান গলির ভেতর ঢুকে পড়লো। উদ্দেশ্য বাসায় ফেরার আগে এক কাপ চা।

আজ চা’র দোকানের সামনে একজন খদ্দেরও নেই। দোকানদার একলা বসা। খালি গাঁ। সমিরকে আসতে দেখেও তেমন কোন ভাবান্তর দেখালো না।

‘মামা। এককাপ চা বানান তো।’, বলল ইমরান হাত ঘড়ি দেখতে দেখতে। ঠিক আটটা বাজে।

‘দুধ চা নাকি রং চা?’ দোকানদার ভাবলেশহীন কণ্ঠে জিজ্ঞাস করলো।

খানিকটা খটকা লাগছে দোকানদারের কণ্ঠস্বর শুনে। একটু যেন অন্য রকম। ধরা যাচ্ছে না। চারপাশে তাকাতে তাকাতে বলল ‘রং চা, মিষ্টি একটু বেশি’। রং চা’র কথা বলতে বলতেই ইমরানের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল আসলে শুধু দোকানদার না। পুরো গলিমত জায়গাটাতেই কিছু একটা গরবর আছে। মেইন রোডের পাশের গলি। সামনে তাকিয়ে দেখা যাচ্ছে মেইন রোড ধরে গাড়ি – মানুষ ছুটে চলছে। কারো গলির দিকে তাকানোর ফুসরত নেই। কিন্তু সব চাইতে অদ্ভুত ব্যাপার গলির ভেতরে কোন শব্দ নেই। পাশ দিয়ে ছুটে চলা গাড়ি, মানুষজন কোন কিছুর শব্দই নেই। গলির ভেতরে গুমোট নিস্তব্ধতা। এমনটা হওয়া তো অসম্ভব।

ইমরান চট করে আবার দোকানদারের দিকে ঘুরলো। দোকানদার নেই। চা’য়ের দোকান বন্ধ। ঠিক তখনই পুরো গলির মধ্যে বিদ্যুৎ ঝলক খেলে যেতে লাগলো। নীল আলো বিচ্ছুরিত হতে লাগলো চারদিকে। সমিরের সামনের মেইন রোডটা আলোক ঝলকানিতে অস্পষ্ট হয়ে গেল। চির চির করে শব্দ, বিদ্যুৎ ঝলকে উঠার আওয়াজ। অতঃপর প্রচণ্ড আলোর ঝলকানি। আসিফ ইমরান জ্ঞান হাড়িয়ে গলির মাঝে লুটিয়ে পড়লো। গলায় ক্যামেরার ব্যাগটা ঝুলছে।


৩.

আসিফ ইমরান একটা ঘরের মেঝেতে পরে আছে। যেমনটা করে গলির মধ্যে পরে ছিল ঠিক সেই ভাবে। একটুও এদিক ওদিক হয়নি পরে থাকার ভঙ্গীতে।

ঘরটির আসবার বলে কিছু নেই। ডানে, বামে, উপরে, নিচে আর সামনে, পেছনে সব দিকে দেয়াল একই রকম। ধাতব ধরণের কিন্তু নীলচে আভা চারদিকে। কোথা থেকে আলো আসছে বোঝা যাচ্ছে না। আলোর উপস্থিতি শুধু আছে।

‘উহ!’ ইমরানের পরে থাকা শরীর থেকে অস্পষ্ট আওয়াজ বেরুলো। জ্ঞান ফিরেছে। একটু ধাতস্ত হয়ে হাটুতে ভর দিয়ে দাঁড়ালো সে। অবাক হয়ে ঘরটা দেখতে লাগলো।

‘স্বাগতম আসিফ ইমরান।’, গুমট কন্ঠে বলে উঠলো সমগ্র ঘরটি যেন।

ইমরানের প্রথমেই যে ধারণা হল কেউ ওকে অপহরণ করে নিয়ে এসে এখানে বন্দী করে রেখেছে। এখন ইন্টারকম জাতীয় কিছু দিয়ে কথা বলছে। এই শহরে কিডন্যাপ হর হামেশাই হয়। অপহরণকারীদের দাবী দাওয়া মতো টাকা পয়সা দিতে না পারলে অপহৃত হওয়া মানুষটির লাশ পাওয়া যায় শহরের আশপাশের কোন নির্জন এলাকায়।

‘আসিফ ইমরান।’, আবার গুমোট কণ্ঠটি শোনা যায়। ‘আমরা জানি আপনার জ্ঞান ফিরেছে। আপনাকে স্বাগতম।’

‘বলুন। শুনছি।’, খসখসে গলায় ইমরান জবাব দিলো। তার ধারণা বদ্ধমূল এখন, কিডন্যাপারদের খপ্পরেই পরেছে। যারা এখন তাকে তাকে দেখছে রুমটিতে থাকা কোন এক লুকানো ক্যামেরা দিয়ে।

‘আপনি কি জানেন আপনি এখন কোথায়?’

‘না। জানি না। জানার তেমন ইচ্ছেও নেই।’

‘আমাদের কাছে যারা আসে তারা সবাই কিন্তু আগে জানতে চায় কেন সে এখানে, আপনি চাচ্ছেন না কেন? মানুষ মাত্রই কৌতূহলী আপনিও তাই। আমরা দেখেছি। আপনি বেশ কৌতূহল নিয়ে এই কক্ষটি দেখার চেষ্টা করছিলেন।’

‘দেখুন, আমি একা মানুষ। আমাকে আটকে টাকা পয়শা কারো কাছ থেকে আদায় করতে পারবেন না। আমার কাছ থেকে টাকা পয়শা চাইলে আমার কাছ থেকেই নিতে হবে। তারচেয়ে আমি আমার মাস্টার কার্ড আর পাসওয়ার্ড দিয়ে দিচ্ছি। ইচ্ছে মতো টাকা তুলুন গিয়ে। আমাকে এই ভাবে আটকে রাখার কোন মানে নেই।’

ইমরান একটা বিকট হাসির শব্দ শুনতে পেল। কেমন যেন গাঁয়ে কাঁটা দেয়া টাইপ হাসির শব্দ। তারপর হুট করে নীরবতা। একটু পর কণ্ঠটি আবার শোনা গেলো, ‘ আপনি ভুল করছেন আসিফ ইমরান। আমরা কিডন্যাপার বা অপহরণকারী নই। আপনি আছেন পৃথিবীতে রাখা একটি স্পেসশিপে। আর আমরা পৃথিবীর কেউ নই। আপনাকে মানব আচরণ সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করার কাজে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে।’

‘মানে?, ইমরান অবাক হয়ে তাকালো ওর সামনের দেয়ালের দিকে। কি বলবে বুঝতে পারছে না।

‘হ্যাঁ। আমরা এই গ্রহের বাসিন্দা নই। আপনি ছাড়া আরও আট জন রয়েছে আমাদের এই স্পেসশীপে। তারা আপনার মতো মানুষ। পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকা থেকে এলোমেলো ভাবে মোট নয় জনকে এই স্পেসশিপে নিয়ে আসা হয়েছে। সেই এলোমেলো নিয়ে আসা মানুষের মতো আপনিও একজন।’

‘দাঁড়ান। কি বলছেন এই সব। আমি কি আপনাদের গবেষণার গিনিপিগ?’, ইমরানের মনে হল কোন স্বপ্নে সায়েন্স ফিকশন মুভি দেখছে। এবং সে নিজেই সেই মুভির একটা চরিত্র।

‘অনেকটা তাই। তবে ঠিক গিনিপিগের মতো না। আপনার স্বাধীনতা অনেক। যদি আক্ষরিক অর্থেই গিনিপিগের সাথে নিজেকে তুলনা করেন তাহলে বুঝতে পারবেন।’

ইমরান কখনো অল্পতে ঘাবড়ে যায় না। কিন্তু এই অদ্ভুত কক্ষে অদ্ভুত কণ্ঠস্বর সর্বস্ব একটা যায়গায় তার কাছে সব অলীক লাগছে। ঘাবড়ে গিয়েছে নাকি বুঝতে পারছে না। আমার কি স্বাধীনতা আছে সেটা জিজ্ঞাস করতে গিয়েও সেটা জিজ্ঞাস না করে কণ্ঠে ক্ষোভ নিয়ে বলল, ‘আমাকে দেখে মানুষের কি আচরণ বুঝতে পারছেন শুনি?’

নিজেকে পরীক্ষণের বস্তু ভাবতেই ক্ষোভ চলে আসছে।

‘অনেক কিছু। যেমন আপনি প্রথমেই বিশ্বাস করে বসলেন আপনাকে কিডন্যাপ করা হয়েছে। স্বাভাবিক কৌতূহলে জানার চেষ্টা করলেন না আপনি কোথায় বা কোন অবস্থায় আছেন বা কেন আছেন।’

‘ব্যাপার টা স্বাভাবিক না?’

‘হ্যাঁ। স্বাভাবিক। মানুষদের জন্য এটা স্বাভাবিক। এটা মানুষের আচরণগত বৈশিষ্ট্য। যখন কোন একটা কিছু কেউ বিশ্বাস করে ফেলে সে তখন অন্য কিছু পর্যালোচনা করে না। কোন কৌতূহল প্রদর্শন করে না, চেষ্টা থাকে না একটু ভালো করে দেখার অথবা জানার। যদিও কৌতূহল প্রদর্শনও মানুষের সাধারণ বৈশিষ্ট্য কিন্তু বিশ্বাসের আবরণে তা প্রায়ই ঢেকে যায়। বরং প্রায়ই দেখা যায় বিশ্বাসটাকে রক্ষা করার জন্য পর্যবেক্ষণ যথেষ্ট নিরপেক্ষ ভাবে করতে পারে না।’

একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে ইমরান মেঝেতে পা গুটিয়ে বসতে বসতে বলল, ‘এই আচরণ বোঝার জন্য আমাকে এখানে আটকে রেখেছেন? কতক্ষণ রাখবেন আর?’

‘অনেকটা তাই তবে ঠিক এই আচরণ জানার জন্য না। এটা একটা উদাহরণ মাত্র। আরও অনেক সূক্ষ্ম আচরণ আছে সে গুলো জানার চেষ্টা করা হচ্ছে। যেমন, এই বিশ্বাস দিয়ে পর্যবেক্ষণ শক্তিকে দমিয়ে রাখার বিষয়টি মানুষদের মধ্য নিয়মিতি ঘটনা। যে কোন গোঁড়ামি হয় এটার উপরে ভিত্তি করে। আমরা শুধু মিলিয়ে দেখছিলাম যেটা জানি সেটা কতোটা সঠিক। আর এটা স্পষ্ট নয় কতক্ষণ থাকবেন এখানে। আমাদের সংরক্ষিত তথ্যর সাথে আপনার আচরণ বিশ্লেষণ শেষ হলেই চলে যেতে পারবেন।’

‘কেমন করে’?

‘সেটা আপনাকে বললে বুঝবেন না। শুধু বলতে পারি যেভাবে যে অবস্থান থেকে এসেছেন সেই অবস্থাতেই আপনাকে রেখে আসা হবে।’

ইমরান মনে করার চেষ্টা করলো- চা খেতে গলির দোকানে গিয়েছিল সে। তারপর বিদ্যুৎ চমক। তারপর উঠে দেখে এখানে।

‘ইমরান, আমাদের বিশ্লেষণ চলছে। এই সময়ে আপনি কি জানতে চান আমরা কি করছি?’

‘হুম চাই। তবে তার চাইতে আপনাদের বা আপনাদের কাউকে দেখতে পেলে বেশি ভালো লাগতো’।

‘সেটা সম্ভব নয়। আমরা আপনাদের মতো নই। একক আমি বলে কিছু নেই এখানে। আমরা সবাই মিলে এক সাথে আপনার সাথে কথা বলছি।’

‘আপনাদের কথা ধরতে পারছি না।’

‘আপনি যে ঘরটাতে আছেন ধরতে পারেন সেটাও আমাদেরই অংশ। আমরা কোন প্রাকৃতিক নিয়মে সৃষ্টি হওয়া প্রাণী নই। মানুষের ভাষায় আমরা যন্ত্র। আমাদের বানানো হয়েছে। আমরা ঠিক তাই – কোন ধরণের প্রাণী নই। আমাদের তথ্য প্রসেসিং করার অংশটা জৈবিক। অনেকটা আপনাদের কল্পিত বায়োবট এর মতো। যাদের আংশিক অংশ হয় জৈবিক। বিশেষ করে মস্তিষ্কটা। আর বাকিটা যান্ত্রিক। তবে আমাদের বেলা আমাদের যে অংশটা মস্তিষ্ক হিসেবে ব্যাবহার হয় তার পঞ্চান্ন শতাংশ যান্ত্রিক। জৈবিক অংশটার জন্য মহাবিশ্বর বিভিন্ন জৈবিক প্রাণীদের আবেগ হাসি কান্না ব্যাপার গুলো আমাদের পক্ষে অনুভব করা সম্ভব। কিন্তু কে বা কারা আমাদের বানিয়েছে সে সম্পর্কিত কোন তথ্য আমাদের কাছে নেই। আমরা যা জানি সেটা হচ্ছে আমাদের শুধু মহাবিশ্বর গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ছুটে চলতে হবে। বুদ্ধিমান প্রাণী সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। পৃথিবীতে ওই তথ্য সংগ্রহর কাজ চলছে।’

‘জি বুঝেছি’।

ইমরান অসম্ভব কৌতূহল বোধ করতে লাগলো এই আজব স্পেসশিপ নিয়ে, এদের কর্মকাণ্ড নিয়ে। অবাক করার মতো হলেও সত্য এরা অনেক বন্ধুভাবাপন্ন বলে মনে হচ্ছে তার। অনেক প্রশ্ন মাথায় এসে ভীর করছে। জিজ্ঞাস করতে যাবে এমন সময় শুধু শুনলো, ‘আসিফ ইমরান। আপনাকে এখনই আমাদের রেখে আসতে হবে। আমাদের বিশ্লেষণের কাজ শেষ।’

‘আস্তে। দাঁড়ান। আমার কিছু প্রশ্ন ছিল।’

‘আপনাকে ফিরিয়ে দিয়ে আসার জন্য আমাদের শক্তি প্যানেল চালু হয়ে গিয়েছে। হাতে আর সময় নেই বলে দুঃখিত।’


৪.

ইমরান ঘাড়ে হাত দিয়ে উঠে বসল। পরিচিত চা’য়ের দোকানের গলির মাঝে পরে আছে। গলায় ঝুলনো ক্যামেরার ব্যাগ। পাশে চায়ের দোকান। বন্ধ। দুই এক ফোঁটা করে বৃষ্টির ফোঁটা পরছে। ঠাণ্ডা বাতাস আছে। ইমরানের মনে হতে লাগলো চা খেতে গলিতে ঢুকেছিল। চা’র দোকান বন্ধ বলে চলে যাচ্ছিল। তারপর কোন ভাবে উপুড় হয়ে নীচে পরে যায়। বেখেয়ালে ছিল বলে সম্ভবত পরে গিয়েছিল। ঘড়ি দেখল। আটটা দশ। মনে আছে শেষবার যখন ঘড়ি দেখেছিল তখন বাজে আট’টা। ঠিক আট-টা। অবাক কান্ড পরে গিয়ে দশ মিনিট ধরে বেহুঁশ হয়ে ছিল নাকি! পকেটে হাত দিলো। না মানিব্যাগটাও আছে আগের যায়গায়। ওটাতে মাস্টার কার্ড’টা ছাড়া কোন টাকা নেই। থাকার কথাও না। ব্যাগে টাকা রাখে না। প্রয়োজন হলে বুথ থেকে তুলে নেয়। কিন্ত মানিব্যাগটা ইমরানের কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। শাফিরা কিনে দিয়েছিল ব্যাগটি। কপাল ভালো এই সময় কেউ এসে মানিব্যাগ নিয়ে পালায় নই। শহরে ছিঁচকে চোরের আধিক্য আছে।

বাসায় ফেরার সময় মনে হতে লাগলো স্বপ্নে আজ কোন একটা রোবট টোবট নিয়ে কিছু দেখেছিলো। ঘুমের সময় নাকি বেশুশ হয়ে পরে থাকার সময় তা মনে পড়ছে না। আচ্ছা আসলে সে কি পরে গিয়ে বেহুঁশ হয়ে ছিল নাকি ঘুমিয়ে পরেছিল? আরেকটা বিষয় – ঘুমালে যেমন মানুষ স্বপ্ন দেখে বেশুশ হলেও কি তাই দেখে?

না বেশি ভাবা যাবে না। বৃষ্টি জোরে শুরু হয়ে যেতে পারে যে কোন সময়। সমির পা চালাল দ্রুত গতিতে। বাসায় পৌঁছুতে হবে।

 

*গল্পটি সায়েন্স ফিকশন গ্রন্থ পেন্টাকল্প’তে প্রকাশিত  

Leave a Reply

Close Menu