মিস্টার ফিফটি নাইন

১.

রুদ্ধ ঘরের ধাতব দরজার উপরের স্ক্রিনে একটি মুখ ভেসে উথলো। মানুষের মুখ। নিচে লিখা উঠলো মিস্টার ফিফটি নাইন। মিস্টার ফিফটি নাইন এখন যোদ্ধা। গারসিয়ান গ্রহের রাজকীয় সেনা বাহিনির গুপ্ত যোদ্ধা দলের একজন সদস্য সে। এই গুপ্ত বাহিনির নাম গারসিয়ান ফৌজ।

২.

বলা হয়ে থাকে গারসিয়ান ফৌজের যোদ্ধারা পরিপূর্ণ মানুষ না – দানব। খ্যাপাটে ভয়ংকর দানব এরা একেক জন। এই বাহিনীর কাউকে কখনো দেখা যায় না। এমনকি গারসিয়ান স্বাধীনতা দিবসের কুচকাওয়াজের সময় এরা থাকে অনুপস্থিত। গারসিয়ান রাজ যখন গ্রহান্তরে অভিযানে যায় তখন এদের নিয়ে যাওয়া হয়। গারসিয়ান ফৌজ’কে কখনো দেখা না গেলেও অস্তিত্ব সম্পর্কে কারো কোন সন্দেহ নেই। গারসিয়ান ফৌজ তাই রহস্যে ঘেরা এক কিংবদন্তীর নাম।

গারসিয়া গ্রহে প্রচলিত কাহিনী অনুসারে গারসিয়ান ফৌজ গঠিত হয় বিশ বছর আগে। যখন শেষ বারের মতো গারসিয়া রাজ আন্তঃনাক্ষত্রিক এক যুদ্ধে পরাজিত হয় তখন। সেই যুদ্ধে প্রচণ্ড ক্ষয় ক্ষতির সম্মুখীন হয় গারসিয়ান রাজ। গারসিয়ার পার্শ্ববর্তী দুই গ্যাব্রিয়া আর এলুকা গ্রহ দুটির সম্বলিত আক্রমণে সম্পূর্ণ গারসিয়ান সেনা বাহিনীর অর্ধেক হয়েছিল নিহত। ঠিক সেই সময়ে মার্কাস গারসিয়ান গ্রহের গোপন এক অঞ্চলে তৈরি করেছিল গারসিয়ান ফৌজ।

মার্কাস আরেক রহস্যময় চরিত্র। গারসিয়ান ফৌজ থেকে অনেক বেশি রহস্য ময়।

বলা হয় মানুষের আদি নিবাস পৃথিবীতে তার জন্ম। কিন্তু সে ছিল জন্ম থেকেই জাত দস্যু। কৈশোর পেড়িয়ে তারুণ্যে পৌঁছা মাত্রই এক দস্যু দলের সাথে যোগ দিয়ে স্পেশশিপ নিয়ে বেড়িয়ে পরে মহাকাশে। স্পেশীপ আর দলটার নাম ছিল কর্ণিক।

কর্ণিক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে মহাকাশের বিস্তীর্ণ এক অঞ্চল জুড়ে। এরমাঝে একদিন হুট করে মার্কাস মনোনিবেশ করে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং’য়ে। জেনিটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর বিভিন্ন শাখা নিয়ে গবেষণা করতো কর্নিকের ল্যাবরেটরিতে। আর সব চেয়ে ভয়ংকর অংশ হচ্ছে এই পরীক্ষা নিরীক্ষার গিনিপিগ হতো মানুষ।

মালবাহী স্পেসশিপ আক্রমণ করে যে মাপত্র পাওয়া যেত তা লুট করা হতো প্রথমে। পরে আটক মানুষ থাকলে সে পরিণত হতো কর্ণিকে মার্কাসের পরীক্ষা নিরীক্ষার উপকরণে। ওই মানুষদের কাটিকুটি করে বর্বর ধরণের পরীক্ষা চালানো হতো। সেগুলো এতোই মর্মান্তিক হতো যে কর্ণিকে তার বেপরোয়া দস্যু সহকারীরা পর্যন্ত ভয় পেত মার্কাসের ল্যাবরটরিতে ঢুকতে। এই গল্পও আবার চল্লিশ পঞ্চাশ বছর আগেকার কথা।
তারপর কেউ বলতে পারেনা কিভাবে মার্কাস ঠাই নেয় গারসিন রাজ্যে। অনেকে বলে কোন গারসিন মালবাহী স্পেসশিপ লুট করার সময় মার্কাস ধরা পরে। তারপর রাজা তাকে অন্যান্য দস্যু সাঙ্গপাঙ্গ’র দের মতো হত্যা না করে বাচিয়ে রাখে তার ল্যাবটরিতে কাজ করার শর্তে। তবে বেশির ভাগ মানুষ বিশ্বাস করে মার্কাস নিজেই আশ্রয় চায় গারসিয়ান রাজের কাছে। উদ্দেশ্য তার কাজের জন্য অনেক বড় আর উন্নত একটি ল্যাবেরটরি পাওয়া। সাথে কথা দেয় যদি গারসিয়ান রাজ তাকে প্রয়োজনীয় উপকরণ যোগান আর নিজের ইচ্ছে মতো কাজ করার সুযোগ দেয় তাহলে সে রাজকীয় বাহিনীর জন্য বিশেষ একটি দল তৈরি করে দিবে। সেটা সে করেছিল এবং সেই বিশেষ দলটি আজকের গারসিয়ান ফৌজ।
কিন্তু মজার ব্যাপার গারসিয়ান ফৌজের মতো মার্কাসকেও কেউ কখনো দেখেনি। না দেখলেও গারসিয়ান ফৌজ যেমন সত্য বলে সবাই জানে তেমনি মার্কাসকেও সবাই সত্য বলে মানে।

গারসিয়ান ফৌজের ঘটনায় ফিরে যাওয়া যাক। গ্যাব্রিয়া আর এলুকা’র যৌথ বাহিনীর কাছে তখন গারসিয়ানরা পরাস্ত। যৌথ বাহিনীর রোবট চালিত ফ্লাইং সসারে করে ঝাকে ঝাকে সৈন্য এসে লুটপাট করছে গারসিয়া গ্রহটির বড় বড় শহর। এমন সময় একটা শহরে ডিটেক্টরে দেখা যায় কিছু মানুষ লুটপাট চালানো একটা শহরের দিকে ধেয়ে আসছে। তাঁরা পঞ্চাশ কিলোমিটারের মতো দূরত্বে। কোন যান ছিল না তাদের। আসছিলো পায়ে ভর করে। তাই কেউ পাত্তা দিলো না। সবাই ছিল ব্যাস্ত লুটপাটে। তখন যৌথ বাহিনী হুট করে আবিষ্কার করলো কিছু অদ্ভুত গরনের মানুষ প্রচন্ড ক্ষীপ্রতায় তাদের দিকে ধেয়ে আসছে। গারসিয়া বাসী বা কোন মানুষের এমন ক্ষিপ্রটায় ধেয়ে আসা সম্ভব নয়। পঞ্চাশ কিলোমিটার পথ পারি দিয়েছে ওই মানুষ গুলো মাত্র দশ থেকে পনেরো মিনিটে।

তারপর শহরটির যৌথ বাহিনী কচুকাটা হয়েছিলো মিনিট দশেকের মধ্য। দুই ঘণ্টার মধ্যে গারসিয়ায় আর কোন জীবিত গ্যাব্রিয়া বা এলুকা কারো কোন সৈন্য ছিল না।

৩.

আন্তঃগ্যালাক্টিক কেন্দ্রীয় ইন্টিলিজেন্স রিপোর্টে বলা হয়েছে গুপ্ত গারসিয়ান ফৌজ সম্পর্কে – এটি গারসিয়ান রাজের বিশেষ গুপ্ত বাহিনী। ধারণা করা হয় দস্যু মার্কাস কিছু মানুষের ডিএনএ’ এর সাথে বিলুপ্ত এপ জাতীয় প্রাণীর বৈশিষ্ট্যর কোন ধরণের সংমিশ্রণ এনে কৃত্রিম উপায়ে কিছু মানুষের জন্মদেয়। এরা মানুষ অপেক্ষা অসম্ভব দ্রুতগামী। কোন অপরাধ বোধ নেই। কোন আবেগ নেই। নেই কোন অনুশোচনা বোধ। এমনটা করতে এদের মস্তিষ্কর বেশ কিছু অংশর বৃদ্ধি হ্রাস জেনেটিকালি নিয়ন্ত্রণ করে করা হয়েছে। এই গুপ্ত গোষ্ঠীর কারো কোন নাম নেই। লিঙ্গ নেই। ডাকা হয় নাম্বার দিয়ে। তবে প্রতিটা নাম্বারের আগে মিস্টার শব্দটা জুড়ে দিয়ে নাম হিসেবে চালানো হয়। নিচে বিশেষ দ্রষ্টব্য দিয়ে লেখা – এদের সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানার চেষ্টা করা হচ্ছে।

৪.

রুমের দরজা ঘুলে গেল ধীরে স্থির ভাবে। মিস্টার ফিফটি নাইন রুমে প্রবেশ করলো। স্বাভাবিক মানুষ থেকে সে খানিকটা লম্বা। ভাবলেশহীন চেহারা। চোখ গুলো অসম্ভব শান্ত।

একটা কন্ট্রোল প্যানেলে ঝুকে যাক করছিল এক বৃদ্ধ। সাদা চুল। পোড় খাওয়া শরীর। ইনি মার্কাস। গারসিয়ান বাহিনীর স্রষ্টা।

মার্কাস ঘুরে তাকালো মিস্টার ফিফটি নাইনের দিকে।

‘মিস্টার ফিফটি নাইন।’

‘জি স্যার। ‘

‘এখন এখানে এসেছ কেন?’, মার্কাসের ভ্রু খানিকটা কুঞ্চিত হলো।

‘একটা কথা জিজ্ঞাস করতে।’, নির্লিপ্ত কণ্ঠ মিস্টার ফিফটি নাইনের।

‘কি কথা? তোমার তো কোন কথা জিজ্ঞাস করার কথা না। তোমাকে এমন ভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে যেন কোন প্রশ্ন না থাকে।’

‘জি স্যার। আমি জানি। তবে আজ কেন আমাকে এই ভাবে তৈরি করা হয়েছে সেটা জানার জন্য এসেছি।’

মার্কাস মিস্টার ফিফটি নাইনের দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে কন্ট্রোল প্যানেলের দিকে তাকালো। কোন একটা সুইচ চাপ দিতেই মিস্টার ফিফটি নাইনের মস্তিষ্কের ত্রিমাত্রিকিক একটা ছবি সামনে চলে আসে। ছবিটি ঘুরতে লাগলো। মার্কাস ছবিটি দেখতে দেখতে আরও চোখ কুঁচকিয়ে ফেলে।

কোন অজ্ঞাত কারণে মিস্টার ফিফটি নাইনের মস্তিষ্কের যে অংশটা কৌতূহলের উদ্ভব ঘটায় সেটা সক্রিয় হয়ে আছে। যা বন্ধ করে রাখা হয়েছিলো যখন মিস্টার ফিফটি নাইন সহ সব গারসিয়ান ফৌজদের তৈরি করা হচ্ছিল তখন থেকেই। কিন্তু ওটা এখন সক্রিয়। আবেগ অনুভূতির অংশ গুলো আগের মতোই আছে, বন্ধ হয়ে আছে। শুধু নেই কৌতূহলের অংশটি।

‘স্যার মার্কাস আমি জানতে এসেছি কেন আমাকে এই ভাবে তৈরি করা হয়েছে? সাধারণ মানুষের কোন চারিত্রক বৈশিষ্ট্য কেন আমার বা আমাদের পুরো ফৌজের কারো নেই।’

‘সেটা তোমার জানার অধিকার নেই।’

‘কেন নেই?’

‘সেটা তোমাকে জানাতে আমি বাধ্য নই।’

‘আপনি বাধ্য কারণ আপনি আমাদের তৈরি করেছেন। আপনি না করলে বাধ্য হতেন না।’

‘তুমি কি আমাকে শেখাতে এসেছ কোনটা করতে আমি বাধ্য আর কোনটা করতে বাধ্য নই?’

‘না। আমি শুধু জানতে এসেছি কেন আমি অন্যরকম?’

সারা জীবন দস্যুতা করা আর দাম্ভিকতার শীর্ষে থাকার কারণে মার্কাসকে কেউ কারণ জিজ্ঞেস করবে আর সে সেটার উত্তর দিবে এমনটা হবার নয়। তাছাড়া এই মিস্টার ফিফটি নাইনের মস্তিষ্ক বেশ কিছুদিন ধরেই মার্কাসের নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাচ্ছিল। আগেই চেয়েছিল একে হত্যা করে আরেকটা ক্লোন বানিয়ে নিবে। যেমনটা সে করে আসছে গত বিশ বছর ধরে। এখন করছে বেয়াদবি। নিজেকে আর আটকে রাখতে পারল না মার্কাস। চটে গিয়ে সামনের টেবিলে রাখা ছোটো আগ্নেয়াস্রটা নিয়ে নিয়ে মিস্টার ফিফটি নাইনের দিকে তাক করে ট্রিকার চেপে দিতে দিতে বুঝতে পারল জীবনের শেষ ভুল্টা সে মাত্র করে ফেলেছে।

মিস্টার ফিফটি নাইন অসম্ভব ক্ষিপ্রতায় এক দিকে সরে গিয়েছে। মার্কাস ট্রিগার চাপার আগেই দেখল একটা ধারালো তার কাটার যন্ত্র ছুটে আসছে মুখ লক্ষ্য করে। মাঝ থেকে তাকে এফোঁড় ওফোঁড় করে দেবার জন্য এটা যথেষ্ট। মার্কাস মিস্টার ফিফটিনাইনকে দিয়েছে অসম্ভব গতি ও ক্ষিপ্ততা।

 

*গল্পটি সায়েন্স ফিকশন গ্রন্থ পেন্টাকল্প’তে প্রকাশিত 

Leave a Reply

Close Menu