তুমি যেভাবে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চা শুরু করতে পারো আর যে টেলিস্কোপ তোমার প্রয়োজন

আকাশ পর্যবেক্ষণ কেন ?

জার্মান ঐতিহাসিক আকাস্টাস উইলিয়াম হ্যারে জ্ঞানী ও ধ্যানী মানুষ সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছিলেন, Every wise man lives in an observatory। উনার পর্যালোচনা ছিলো মানুষের ইতিহাস থেকে, যেখানে আমরা দেখি দশ হাজার বছরের মানুষের সুসভ্য হয়ে উঠার ইতিহাসে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতিষ্ক সংক্রান্ত জ্ঞানের চর্চা যেন ওতপ্রোত ভবে জড়িয়ে আছে। কেন এমনটা হয়েছে? কারণ আমরা আকাশ দেখে মহাবিশ্বে আমাদের নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে একটি ধারণা করার চেষ্টা করেছি। কৌতূহলী হয়েছি আর সেই কৌতুহল আমাদের ধীরে ধীরে অন্যন্য প্রাণীদের থেকে আলাদা করে আমাদের মানুষ হয়ে উঠতে সাহায্য করেছে। তাই হয়তো বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন উইলিয়াম হকিং মন্তব্য করেছিলেন,

“Remember to look up at the stars and not down at your feet. Try to make sense of what you see and wonder about what makes the universe exist. Be curious. And however difficult life may seem, there is always something you can do and succeed at. It matters that you don’t just give up.”

আমাদের আকাশ দেখা

সচরাচর আমরা যখন আকাশ দেখি তখন আকাশ দেখি খালি চোখে, কোন কোন সময় আকাশ দেখি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে। যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে প্রথম আকাশ দেখেছেন গ্যালিলিও গ্যালিলাই। তাও সেটা অর্ধ সহস্র বছর আগের কথা নয়।

দিনের আকাশে আমরা দেখি সূর্য। রাতের আকাশে থাকে না সূর্য তাই সূর্যর প্রভাবের বাইরে থাকায়  অন্যন্য আলোক উৎস গুলো প্রকট হয়ে আমাদের চোখে দেখা দেয়। যা কিছু আমরা দেখি আকাশের দিকে তাকিয়ে তারা সব জ্যোতিষ্ক। সূর্য যেমন জ্যোতিষ্ক অন্যান্য আলোক উৎস গুলোও জ্যোতিষ্ক। তবে সকল জ্যোতিষ্ক কিন্ত নক্ষত্র বা তারা নয়। সূর্য যেমন তারা তেমনি চাঁদ হচ্ছে আমাদের আকাশ পৃথিবীকে ঘিরে আবর্তন করা উপগ্রহ যা আমাদের চোখে ভাস্কর হয় সূর্যের আলো তাতের পতিত হয়ে প্রতিফলিত হয় বিধায়। তেমনি অন্য গ্রহদের দেখি প্রতিফলিত আলোর জন্য আর বাদবাকি যা কিছু দেখি তারা মূলত নিজেরা আলো তৈরি করে। সেগুলোর তালিকায় পাওয়া যাবে নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, নেবুলা সহ ইত্যাদি।

মনে রাখতে হবে আকাশ দেখার জন্য আমাদের যা যা প্রয়োজন সেগুলো হচ্ছে –

  • জ্যোতিষ্ক হতে আসা আলো
  • মেঘবিহীন অন্ধকার (আলোক দূষণ মুক্ত) আকাশ

খালি চোখে কি কি দেখা যায় ?

আমরা খানিক আগেই উল্লেখ করেছি খালি চোখে আর যন্ত্রপাতি এই দুই ভাবে আকাশ দেখার কথা। এবার আমরা জানবো মূলত খালি চোখে আকাশে কি কি দেখা যায় তাদের কথা। খালি চোখে আমরা যা যা দেখি তাদের একটা তালিকা ও তাদের পর্যবেক্ষণ নিয়ে আলোচনা করলে পাবো,

১। সূর্য

সূর্য আমাদের সবচাইতে নিকটে অবস্থানরত নক্ষত্র, তাই সব চাইতে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কও। খালি চোখে খুব সহজেই সূর্য দেখা যায় কিন্তু সূর্য দেখা খুব বিপদজনক। অতিরিক্ত উত্তাপ ও বিকিরণের সূর্য থেকে আমাদের চোখে এসে পরে বিধায় চোখ খারাপ হবার সমূহ সম্ভাবনা থাকে।

২। চাঁদ

চাঁদ আমাদের পৃথিবী অর্থাৎ আমাদের আবাস গ্রহটিকে ঘিরে ঘুরতে থাকা উপগ্রহ। সূর্যের আলো চাঁদের পৃষ্টে আপতিত হয়ে প্রতিফলিত হয় বিধায় আমরা চাঁদকে দেখতে পাই। চাঁদের কোন নিজস্ব দৃশ্যমান আলো নেই।

৩। গ্রহণ

দুই ধরণের গ্রহণ আমরা দেখে থাকি। প্রথমত সূর্য গ্রহণ, এই সময়ে চাঁদ পৃথিবীতে আসতে সূর্যকে বাধা দেয় তাই আমরা সূর্যকে দেখতে পারি না। এবং আংশিল দেখি। তবে এই দেখা খালি চোখে দেখা সম্ভব হলেও বেশ বিপদজনক। সূর্য থেকে আগত শক্তিশালী আলোর বিচ্ছুরন আমাদের চোখে আঘাত করে ক্ষতি সাধণ করতে পারে।  তাই সরাসরি সূর্যগ্রহণ না দেখা উচিত। দ্বিতীয়ত, চন্দ্রগ্রহণ। চন্দ্রগ্রহণ তখনই হয় যখন সূর্যের আলো চাঁদের পৃষ্ঠে পরার সময় পৃথিবী দ্বারা বাধাগ্রস্তহয় এবং পৃথিবীর ছায়া চাঁদে পরে বিধায় চাদের উজ্জ্বলতা ম্রিয়মান হয়ে একটি রক্তিমাভ রঙ ধারণ করে। আমরা তাকে বলি ‘ব্লাড মুন’।

৩। গ্রহ

আমরা খালি চোখে মূলত জ্যোতিষ্ক আকারে  পাঁচটি গ্রহ দেখতে পারি। যারা প্রত্যেকেই সূর্যকে ঘিরে পৃথিবীর মতোই আবর্তন করছে। গ্রহ গুলো হলো বুধ (দিগন্তে সূর্য অস্তমিত হবার সময় দেখা যায়, সচরাচর দেখা পাওয়া বেশ কঠিন), শুক্র (সূর্য চাদের পরে সব চাইতে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কটি শুক্র গ্রহ, সন্ধ্যা বেলায় পশ্চিমাকাশে আর ভোরের শুরুতে পূব আকাশে দেখা মেলে। তাই সন্ধ্যা তারা আর শুকতারা নামে ব্যপক পরিচিত), মঙ্গল (লাল জ্বলজ্বলে জ্যোতিষ্ক, বেশ উজ্জ্বল।), বৃহস্পতি (বড় ও উজ্জ্বল, লালচে, এবং সহজে চোখে পরার মতো গ্রহ), শনি (নিলচে বা সাদাটেও বলা যায়, একটু কম উজ্বল অন্যন্য  গ্রহ গুলো থেকে তবে অন্যন্য নক্ষত্রদের থেকে বেশি উজ্বল হওয়ায় সহজেই চোখে পরে)।

৪। কৃত্রিম উপগ্রহ

রাতে আকাশে তাকিয়ে থাকলে প্রায়ই মনে হবে ধীর লয়ে কিন্ত দ্রুত গতিতে আকাশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে চলছে কিছু আলোক বিন্দু বা জ্যোতিষ্ক। এরা খুব একটা উজ্জ্বল নয়। তবে মজার ব্যপার হচ্ছে এরা কিন্তু কোন প্রাকৃতিক কিছু নয়। সব গুলোই মানুষ্যতৈরি উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট। যেগুলো প্রদক্ষিণ করছে পৃথিবীকে প্রতিনিয়ত। কৃত্রিম উপগ্রহ গুলোর অনেক গুলো নির্দিষ্ট অঞ্চলের উপর স্থির হয়ে আছে যাদের চলাফেরা আমরা আসলে আলাদা করে অনুধাবন করতে পারি না কিন্তু যেগুলো ভূ-স্থির নয় সেগুলোই আমরা দেখে থাকি।

৫। ধূমকেতু, উল্কা, গ্রহাণু

উল্কা আমরা প্রায় প্রতিনিয়ত দেখি। উল্কা আমাদের কাছে পরিচিত ‘তারা খসা’ নামে। খালি আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলে প্রায়সময় মনে হয় এই বুঝি কোন জ্যোতিষ্ক ছুটে এক প্রান্ত থেকে আকাশের অন্য প্রান্তের দিকে দ্রুত হারিয়ে গেলো। বস্তুত একেই আমরা বলছি উল্কা। উল্কা মূলত তখনই তৈরি হয় যখন আমাদের পৃথিবীকে ঘিরে যে বায়ুমন্ডল রয়েছে তার সংস্পর্শে এসে কোন বস্তু-পদার্থ জ্বলে উঠে ঘর্ষণ জনিত ক্যেমিকাল সংঘর্ষের  কারণে। এই ছুটে চলা ও জ্বলে ওঠা কয়েক মিলি সেকেন্ড থেকে দুই এক সেকেন্ড সময় সীমার মধ্যে ঘটে। তো প্রশ্ন হতে পারে কোন বস্তু গুলো আমরা পাই উল্কা হিসেবে? উত্তর হলো গ্রহাণুরাই মূলত উল্কার কারণ। গ্রহাণু হলো মহাকাশে ছুটের বেড়ানো গ্রহদের অবশেষ কিংবা গ্রহ কণা, টুকরো টাকরা। যা বায়ুমন্ডলে এসে জ্বলে উঠে। উল্কা গুলো যেমন হতে পারে মহাকাশে ছুটে চলা বস্তু-পদার্থ তেমনি কোন কৃত্রিম উপগ্রহর পরিত্যাক্ত  অংশবিশেষ। তাছাড়া আরেকটা জিনিস আমরা খুব সহজে দেখি যদিও নিয়মিত দেখা যায় না। কালে ভদ্রে দেখা যায়। আর সেটা হলো ধুমকেতু। ধুমকেতু মূলত বরফের মতো বস্তুপিন্ড। সূর্যের কাছাকাছি অবস্থান কালে সূর্য রশ্মির তেজে সূর্যের বিপরিত দিকে ধুম্র পুচ্ছর মতো আকার ধারণ করে। দেখে মনে হয় সামনে একটা পিন্ড আর পেছনে জ্বলছে জ্বলন্ত আগুন।

৬। মেরু জ্যোতি

মেরু জ্যোতি উত্তর মেরুর কাছাকাছি ও দক্ষিণ মেরুর কাছাকাছি দেখা যায়। ইংরেজিতে বলে Aurora, পৃথিবীর ম্যাগনেটিক ফিল্ডের বিচ্ছুরন উত্তর ও দক্ষিণ মেরুতে সবচাইতে বেশি। সেই ম্যাগনেটিক ফিল্ডের সাথে সূর্য বিকিরনের মিথস্ক্রিয়ার দরুন দেখা যায় এই আরোরা। আর আরোরা দেখা যায় খালি চোখেই।

৭। তারা বা নক্ষত্র

আকাশে খালি চোখে দেখতে পাওয়া বাকি সব কিছু মূলত নক্ষত্র বা তারা। টুকে রাখার মতো একটি তথ্য হচ্ছে আমরা খালি চোখে যত তারা দেখি তারা বলা যায় আমাদের গ্যালাক্সি অর্থাৎ মিলকিওয়ে গ্যালাক্সির আভ্যন্তরীণ নক্ষত্র রাজি। এই তারা গুলো বিভিন্ন রকম বা রঙ এর হয়ে থাকে। আবার থাকে স্তবক তৈরি করে। কখনো গুচ্ছ ধরে। যারা সবাই খুব স্পষ্ট নয় খালি চোখে দেখার জন্য তবে আমরা সহজেই পরিষ্কার আকাশে এইসবের একটি আভাষ পাই।

  • বিষম তারা : বেশ কিছু তারা আছে যাদের আমরা দেখয়ার  সময় লক্ষ্য করতে পারি যে, এই ঔজ্জ্বল্য হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে নির্দিষ্ট বা অনির্দিষ্ট সময় পর পর। ঔজ্জ্বল্যের এই তারতম্যের কারণেই একে বলা হয় বিষম তারা। বিষম তারা আবার বেশ কয়েক ধরণের হয়।
    প্রথমত ,স্বাভাবিক বিষম তারা (Intrinsic variables) যা আবার দ্রুত স্পন্দনের স্পন্দিত বিষমতারা (Pulsating variables) ও শেফালি বিষমতারা (Cepheid variable star) ভাগে ভাগ করা হয়। শেফালি বিষম তারা এর মাঝে  যা খুব দ্রুত  এবং নিয়ম তান্ত্রিক ভাবে উজ্জ্বলতার বৃদ্ধি কম দেখায়। এই ধরণের তারাদের আরো অনেক ভাগে ভাগ উপভাগ করা হয় প্রয়োজন অনুসারে।
    দীর্ঘ স্পন্দনকালীন বিষমতারা (Long period variables) যা অনেকটা সময় নিয়ে ধীর লয়ে উজ্জ্বলতার পরিবর্তন দেখায়। এই বিষম তারা গুলো আবার চমৎকার কিছু নামের উপ বিভাগে বিভক্ত –  মিরা বিষমতারা (Classical variable star), সামান্য অনিয়মিত বিষমতারা (Semiregular variables), মন্থর অনিয়মিত বিষমতারা (Slow irregular variables)। আমরা নাক্ষত্রিক বিস্ফোরণ জনিত কারণে আরো দেখি বিস্ফোরণধর্মী বিষমতারা (Cataclysmic or explosive variables) ও প্রক্ষেপিত বিষমতারা (Eruptive variables)
    দ্বিতীয়ত,  অপ্রকৃত বিষম তারা (Extrinsic variables)। অনেক সময় একাধিক তারা পরস্পরকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। উভয় তারা পৃথিবী থেকে আমরা যখন দেখি তখন একটি তারা মনে হয়। এক্ষেত্রে উভয় নক্ষত্রের মিলিত ঔজ্জ্বল্য পৃথিবী থেকে বেশে জোরালো মনে হয়। কিন্তু আবর্তি এই তারাগুলোর এক বা একাধিক নক্ষত্র যখন কোনো একটি বিশেষ তারার আড়লে পড়ে, তখন এর ঔজ্জ্বল্য বেশ কম মনে হয়। ফলে পৃথিবী থেকে এই তারা সমষ্টির (যা পৃথিবী থেকে একটি তারা মনে হয়) ঔজ্জ্বল্যকে কম-বেশি দেখা যায়। গ্রহণধর্মী বিষমতারা (Eclipsing binaries) ও ঘূর্ণন বিষমতারা (Rotating variables) হচ্ছে এই ধরণের বিষম তারার উদাহরণ।ডেল্টা সেফি,  আলগোল বিষমতারা গুলো  খালি চোখে আমরা দেখতে পারি।

৮। তারাস্তবক

তারাদের গুলো মূলত নানা ধরণের সমষ্টিগত এক ধরণের ক্লাস্টার। খালি চোখে খুবই পরিষ্কার আকাশে যে সব তারাস্তবক গুলো দেখা যায় সে গুলো হচ্ছে – প্লিইডেস,হায়াডেস, পারসিয়াসের ডাবল ক্লাস্টার। গুচ্ছ স্তবক তৈরি করেও কিছু স্তবক বা ক্লাসটার আমরা দেখি যেমন ওমেগা সেন্টরি, হারকিউলিস কাস্টার (এম ১৩)।

৯। নীহারিকা

বর্তমানে আমরা নীহারিকা বলতে গ্যাসীয় পুঞ্জকে বুঝে থাকি। আর যেহেতু পুঞ্জিভূত গ্যাসীয় অঞ্চলে নক্ষত্র তৈরি হয় তাই অন্য ভাবে বলা যেতে পারে নীহারিকাতে নক্ষত্রর আবির্ভাব ঘটে যদিও সব নীহারিকা নক্ষত্রর আঁতুড়ঘর নয়। খালি চোখে ঠিক দেখা নয় আঁচ করতে পারা যায় কিছু নীহারিকাকে। পরিচিত কয়েকটি হলো,  কালপুরুষের নীহারিকা (এম ৪২), ট্রিফিড নীহারিকা, লেগুন নীহারিকা, কারিনা নীহারিকা।

১০। গ্যালাক্সি

আমরা যতকিছু বা যত জ্যোতিষ্ক দেখি খালি চোখে তার সব কিছুই বলা যায় একটা পুঞ্জিভুত অংশের অংশ যার নাম মিল্কিওয়ে। আর আমরা মিল্কিওয়ে হচ্ছে একটি গ্যালাক্সি। যাতে আমাদের নিবাস। খালিচোখে মিলকিওয়ের অংসবিশেষ আমরা অনুধাবন করতে পারি। আর মিল্কিওয়ের বাইরে খালি চোখে আমরা একমাত্র দেখতে পারি এনড্রোমিডা গ্যালাক্সি। যদিও বড় ম্যাগেলানিক মেঘ, ছোট ম্যাগেলানিক মেঘ নামের দুইটি বামন আকৃতির গ্যালাক্সি মতো গ্যাসীয় প্রবাহ যা আমাদের গ্যালাক্সিকে ঘিরে বিচরণশীল।  তবে এদের দেখা পাওয়াটা শুধু কষ্টসাধ্য নয়। বরং দুষ্কর।

সৌখীন আকাশ পর্যবেক্ষণের যন্ত্রপাতি 

খালিচোখে আকাশ দেখার কথা আমরা এতক্ষণ আলোচনা করেছি। কিন্ত সত্য বলতে কি আকাশ একদম পরিষ্কার এবং ঘুটঘুটে অন্ধকার না হলে আমরা খালি চোখে যারা বলেছি তার অধিকাংশই বলতে গেলে দেখা যাবে না। তাছাড়া যা যা বলেছি সেই সব আরো স্পষ্ট দেখতে গেলে আমাদের যন্ত্রপাতির সাহায্য নিতে হবে। আকাশী জ্যোতিষ্কগুলোকে খুঁজে পাওয়াও বেশ কষ্টকর কাজ। সে গুলো সহজে পাবার জন্যও আমাদের যন্ত্রপাতির সাহায্য নিতে হয়। আকাশ পর্যবেক্ষনের জন্য সৌখীন (প্রফেশনাল বা পেশাদারির ক্ষেত্রে নয়) পরিষ্কার আকাশের বাইরে যা কিছু প্রধানত দরকার সেসব হচ্ছে –

  • টেলিস্কোপ : অত্যাবশ্যকীয় উপকরণ এবং বলা যেতে পারে আকাশ পর্যবেক্ষণের জন্য প্রধান উপকরণ
  • বিনঅকিউলার : কোন কারণে টেলিস্কোপ সহজ লভ্য না হলে বিনঅকিউলার দিয়ে বেশ রোমান্টিক ধরণের পর্যবেক্ষন করা যেতে পারে।
  • ক্যামেরা : একটু এডভান্স লেভেলের পর্যবেক্ষকের জন্য। সাধারণত ডিএসএলআর ক্যামেরা গুলোর নাইট মুড ফিচার দিয়েই সাদা চোখে যে পর্যবেক্ষন চালনা করা সম্ভব না সেটা করা যায়। তাছাড়া টেলিস্কোপের সাথে জুড়ে দিয়ে দুর্দান্ত জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত ছবি বা ভিজুয়াল ডাটা কালেক্ট করা সম্ভব।
  • টর্চ/লাল আলো : মৃদু আলোর প্রয়োজন হতে পারে স্কাই অবজারভেশনের সময় এবং তখন মৃদু লাল আলো ব্যবহার করা উচিত। অন্য আলো চোখে বেশি সংবেদনশীল। রাতের আধারে খাপখাইয়ে সাদা আলো বন্ধ করলেও দ্রুত কাজ পর্যবেক্ষন চালানো কষ্টসাধ্য। ত্রিশ মিনিটের মতো বসে থাকতে হয় আধারে চোখের খাপ খাইয়ে নেবার জন্য।
  • ম্যাপ/বই/পজিশনিং সফটওয়্যার : স্কাই ম্যাপ বা বই দরকার পরে কোন সময়ে কোথায় কোন জ্যোতিষ্ককে আমরা দেখছি তা বুঝার জন্য। নতুবা অনেক জ্যোতিষর ভীড়ে কোনটা দেখছি তা হারিয়ে যেতে পারে। যে কোন সময়। তবে আজকাল লাইভ লোকেশন ডিটেক্টর সম্বৃদ্ধ স্মার্ট ফোনের কিছু স্কাই ম্যাপ এপলিকেশন বা ল্যাপটপে স্টেলেরিয়াম সফটওয়্যার চালিয়েও জ্যোতিষ্কদের খুঁজে পাওয়া বেশ সহজ এবং জনপ্রিয়।

সাধারণ বা ছোট টেলিস্কোপ / বিনঅকিউলারে কি কি দেখা যায় ?

খালিচোখে আমরা যা যা দেখতে পারি পরিষ্কার আকাশে সেইসব সাধারণ অর্থেদেখা যায় যে কোন টেলিস্কোপ বা বিনঅকিউলারের মাধ্যমে তবে দেখা যায় আরো ভালো করে। যেমন নীহারিকা আমরা হয়তো শুধু আঁচ করতে পারতাম খালি চোখে কিন্তু এই যন্ত্রপাতি ব্যবহার করলে অনেকটা স্পষ্ট আকারে দেখতে পারি। ঠিক তেমনি এন্ড্রোমিডা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠবে। তাছাড়া টেলিস্কোপে যা দেখা যাবে কিন্তু খালি চোখে দেখা যায় নি এমন উল্লেখ যোগ্য দৃশ্যমান কিছু বিষয়ের আমরা আরেকটা তালিকা তৈরি করতে পারি।

  • চাঁদের গায়ের গর্ত/ক্রাটার্স, খানা খদ্দ, চন্দ্র কলার বা চাঁদের ক্রিসেন্টের সময় চন্দ্র পৃষ্টে আলোছায়ার অবয়ব গুলো।
  • সৌর কলঙ্ক (সূর্যের ম্যাগনেটিক ফিল্ড সহ নানা বিধ কারনে কালো পরা কালো স্পট।)
  • ধূমকেতু (খালি চোখেই দেখা যায় তবে টেলিস্কোপিক ভিউ দৃশ্য আরো কয়েক গুন স্পষ্ট করে তোলে, বিশেষত দূরের ধুমকেতু গুলো দৃশ্যমান হয়ে ওঠে যেগুলো খালি চোখে দেখাই যায় না।)
  • বৃহস্পতির চার বৃহৎ উপগ্রহ ( এই সেই বিখ্যাত উপগ্রহ যাদের গ্যালিলিও পর্যবেক্ষন করে সিদ্ধান্তে উপনিত হয়েছিলেন যে মহাবিশ্বের সব কিছুর কেন্দ্রে পৃথিবী নয়। এবং পৃথিবীকে কেন্দ্র করে সব কিছু আবর্তন করছে না।)
  • শনির বলয় এবং উপগ্রহ ক্যাসিনি (শনি খালি চোখে দৃশ্যমান হলে শনির বলয় আর শনির উপগ্রহ ক্যাসিনি টেলিস্কোপ আর বিনঅকিউলার ছাড়া দেখা যায় না।)
  • ডাবল স্টার তথা দুইটি নক্ষত্র এক সাথে বা কাছাকাছি থাকে, যদিও মনে হয় খালি চোখে এরা একটি আছে। মাইজার (সপ্তর্ষি), ক্যাস্টর (মিথুন), আলবিরিও (হংস), এপসাইলন লাইরি (লাইরা/বীণা)।
  • কর্কট নীহারিকা, বলয় নীহারিকা, ইত্যাদি।

টেলিস্কোপের নানান রকম   

টেলিস্কোপ কবে কে আবিষ্কার করেছে সেটা বলা আসলে কষ্টকর। তবে কে প্রথম আকাশ দেখার জন্য ব্যবহার শুরু করেছিলো সেটা আমরা সবাই জানি। তিনি হলেন গ্যালিলিও গ্যালিলাই। তার হাত ধরেই আমরা নতুন করে পর্যবেক্ষণ নির্ভর বিজ্ঞান চর্চার শুরু করেছিলাম। তিনি যে টেলিস্কোপ ব্যবহার করেছিলেন সেটা বেস সরল ধরণের। আমরা সেই টেলিস্কোপকে ক্রমোন্নতির মাধ্যমে ভিতরের মেকানিজমে যেমন জটিলতা এনেছি তেমনি ভিজ্যুয়ালিটিকে করেছি আরো ভালো। আর প্রতিক্ষেত্রেই টেলিস্কোপের নানান প্রকরণ তৈরি করেছি। সাধারণত যে সব ধরণের টেলিস্কোব সৌখীন জ্যোতির্বিদরা ব্যবহার করেন সে গুলোর সাথে আমরা চট জলদি পরিচিত হয়ে নিতে পারি।

  • প্রতিসারক (রিফ্র্যাকটর)
    – গ্যালিলিয়ান
    – কেপলারিয়ান
  • প্রতিফলক (রিফ্লেকটর)
    – নিউটনিয়ান
  • ক্যাটাডাইঅপট্রিক
    – শ্মিট-ক্যাসেগ্রেইন (Schmidt–Cassegrain)
    – ম্যাকসুটভ-ক্যাসেগ্রেইন (Maksutov Cassegrain)

বিনঅকিউলার 

বিনঅকিউলার অনেকটার প্রতিসারক বা রিফ্রাকটর টেলিস্কোপের গাঠনিক কাঠামো দিয়ে অনুসরণ করে তৈরি করা হয়। তবে এখানে প্রিজমের ব্যবহার হয়।

পরিশেষে কি রকম টেলিস্কোপ কেনা উচিত ? 


কোন ধরণের যন্ত্রপাতি কিনবো জ্যোতির্বিজ্ঞানের পর্যবেক্ষনের জন্য তার অনেকটাই নির্ভর করে আকাশের কি কি দেখবো আর কতোটা করে দেখতে চাই তার উপর। সেই সাথে স্থানান্তর সুবিধা , সহজ ব্যবহার যোগ্যতা এসব বিবেচনায় নিতে হবে। অর্থাৎ পুরোটাই ব্যক্তি ইচ্ছার উপর নির্ভশীল।

শুরুটা হতে পারে অবশ্যই বিনঅকিউলার দিয়ে। তারপর প্রয়োজনের তাগিদের এবং ইচ্ছায় আপগ্রেড করে টেলিস্কোপের দিকে অগ্রসর হওয়া যেতে পারে। তবে আকাশ দেখার জন্য যন্ত্রপাতি লাগবেই তেমন কোন কথা নেই। খালি চোখে অনেক দূর অগ্রসর হওয়া যায় যতি নিছক কৌতুহল সম্বৃদ্ধ শখের বিষয় হয় আকাশ দেখা। যদি প্রফেশনাল অথবা এস্ট্রোফটোগ্রাফির দিকে যাওয়ার বাসনা হয় তাহলে ভালো মানের টেলিস্কোপ অবশ্যই থাকতে হবে। সাথে থাকতে হবে লো লাইট সেন্সেটিভ ক্যামেরা।

 

তারপরেও এমেচার টেলিস্কোপ দিয়ে জ্যোতিষ্কদের দেখে যেন আশাহত না হতে হয় তাই এক্সপেক্টেশন আর রিয়ালিটির তুলনামূলক কিছু ছবি দেখা যেতে পারে। যে গুলোর সব গুলো তোলা হয়েছে ঘুটঘুটে অন্ধকার রাতে এবং লাইট পলিউশন খুবই কম। Orion নেবুলার দুইটি ছবি সংযুক্ত করা হয়েছে। যেখানে একটি একশ মিলিমিটার টেলিস্কোপ দিয়ে তোলা অন্যটি তিনশ মিলিমিটার দিয়ে তোলা। যা থেকে বড় টেলিস্কোপের উপযোগিতা সহজে অনুধাবন করা সম্ভব। 

 

এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি

স্টারক্লাস্টার M45

গ্যালাক্সি  M51

Orion বা কালপুরুষ নেবুলা 

Leave a Reply

Close Menu