ধর্ম যেভাবে কাজ করে

 

ধর্ম মাত্রই দুইটা বিষয় নিয়ে কাজ করে। 

এক. আধ্যাত্মিক বিশ্বাস ও আস্থা। যার দ্বারা কোথা থেকে এলাম কোথায় যাবো, চারপাশে সব কিছু কেন হচ্ছে বা অস্তিত্বশীল ইত্যাদি বেসিক জিজ্ঞাসাগুলোর একটা কারণ তৈরি করা। এই অংশটুকু সম্পূর্ণ-ই ব্যক্তিগত। আমার বা আপনার ব্যক্তিগত বিশ্বাস যাই হোক না কেন প্রতিদিনের জীবনে এর কোন প্রভাব পরে না। প্রতিদিনের প্রার্থনা, নামাজ, রোজার মতো বিষয় গুলো এর সাথে সম্পর্কিত।

দুই. আমার এবং সমাজের সবার পারস্পারিক আচার আচরণ কেমন হবে সেটা নির্ধারণ করা। এটা হতে পারে পরিবারের মধ্যকার আচরণবিধি, হতে পারে প্রতিবেশি, রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক যোগাযোগের নিয়মনীতি নির্ধারণ। এইটা ঠিক ব্যক্তিগত বিষয় না। এটা সামাজিক ব্যপার। আপনি কিংবা আমি যদি এই অংশ ভাইয়োলেট করি বা নিজেদের আন্ডারস্ট্যান্ডিং (ভুল বা ঠিক যাই হোক না কেন) এর উপরে ভিত্তি করে কোন ল’ বা নিয়ম ইম্পলিমেন্ট করি তাহলে এর প্রভাব অনেক বিস্তৃত। সামাজিক ডিজাস্টার এবং আনস্ট্যাবিলিটি তৈরি করার জন্য যথেষ্ট। আর এটাই আমরা করে আসছি প্রতিনিয়তো। আমরা চোখ থাকতেও অন্ধর হয়ে অবিশ্বাস করে আসছি ধর্মের অভ্যুদয়ের সময়কার সমাজ ব্যবস্থা এবং বাস্তবতা বর্তমান সময়ে নেই। ভবিষ্যতে সেটা আরো পৃথক হবে বর্তমান সময় থেকে। তাই আগের বাস্তবতা এখনকার বাস্তবতা দিয়ে পরিমাপ করা এক ধরণের বোকামি।

বার দেখা যাক কি করে ডিজাস্টার হয় – ধরা যাক, কোন এক প্রতিষ্টান ঘোষণা করলো তারা ‘এক নং’ অংশ পালন না করলে ‘দুই নং’ অংশ ব্যবহার করে শাস্তি দিবে। এটা খুবই হাস্যকর। কারণ ব্যক্তি বিশ্বাসে ‘এক নং’ সকল শাস্তি বা পুরষ্কার হবে তার বিশ্বাসের ধর্মীয় অবস্থান থেকে। সামাজ যদি দেয় সেটাতে ধরে নিতে হবে সমাজ নিজেকে স্রষ্টা মনে করছে বা স্রষ্টার মতো ডিসিশন নিচ্ছে।

সমাজের আইনের বাস্তবায়নে এখতেয়ারে শুধু সমাজ সংক্রান্ত বিষয়াদি থাকতে হবে। যেমন সামাজিক অপরাধের শাস্তি। কেউ অপরাধ করলো যার ভুক্তভুগী হচ্ছে জনগণ বা অন্য কেউ। তখন সেটার শাস্তি সমাজ নির্ধারণ করতে পারে। কে কি বিশ্বাস করো বা না করলো কিংবা কি ব্যক্তিগত ভাবে পালন করলো বা না করলো সেটা নয়।

দক্ষিণ এশিয়ার আমরা ও আফ্রিকা সহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় মানুষজনই এই পার্থক্যটুকু করতে পারি না। আমাদের প্রচলিত কিছু কাল্ট বিশ্বাস (যেমন মাওদুদি, আইএসয়াইএস, ভারতীয় উগ্রবাদী হিন্দু ইত্যাদি) মনে করে আমার ব্যক্তি বিশ্বাস ভিত্তিক আচার পালন বা ‘এক নং’ আচরণ কি হবে সেটা ‘দুই নং’ অংশ নির্ধারণ করবে। নইলে ঘোষণা দিয়ে আমাকে অধার্মিক দাবী করা হবে। শাস্তি দেওয়া হবে। বয়কট করা হবে। ইত্যাদি। এভাবেই তৈরি হয় আমাদের মৌলবাদি চিন্তাভাবনা বা এক্সটিমিজম।

মজার ব্যপার হলো ইউরোপিয়ানরা এটা ধরতে পেরেছিলো কয়েকশ বছর আগেই। তাই এক আর ‘দুই নং’ ডোমেইন তারা পৃথক করে দিয়েছিলো। এবং এখনো যতটুকু শক্তি আছে সেটা দিয়ে পৃথক রাখার চেষ্টা করছে। ফলে ক্রিশ্চিয়ান বা ইহুদি মৌলবাদী চিন্তাধারা সেখানে এক্সট্রিম আকার ধারণ করছে না আমাদের তুলনায়। তবে তারা একটা সময় আমাদের মতোই ছিলো। হাজার হাজার মানুষ মেরেছে তারাও। কখনো ডাইনি অপবাদ দিয়ে, কখনো বাইবেল অবমাননার অভিযোগে, কখনো এক নং অংশের পরিপন্থি কোন মতবাদ দেয়ার অভিযোগে। এটাই আমরা করে যাচ্ছি এখন। তবে আমাদের অবস্থান আরো বিস্তৃত, হিংস্র আর এগ্রেসিভ। ধর্ষণকে আমরা করছি জায়েজ। ঘুষের সহ যাবতীয় অপরাধে আমরা নিরুত্তাপ। কিন্তু উত্তপ্ত হই কেউ ধর্ম পালন করলো নাকি না করলো না বা বিশ্বাস করলো নাকি করলো না – এমন কিছু বিষয় নিয়ে। এটাই অবক্ষয় – সামাজিক নৈতিকতার চাইতে ব্যক্তিগত ধর্ম পালন নিয়ে আমাদের উৎসাহ। আমরা ভুলে যাই নৈতিকতা যেখানে আছে তারা যেই ধর্মই পালন করুক বা না করুক না কেন তারা সভ্য। মার্জিত। নৈতিকতা বিহীন যত ধর্মই পালন করুক বা না করুক না কেন তারা সভ্য নয়। মার্জিতও নয়। হাজার হাজার এমন উদাহরণ দেয়া সম্ভব। 

ইউরোপে ‘এক নং’ আর ‘দুই নং’ নাম্বারের সেপারেশন তৈরি করতে করতে যে চিন্তাধারার অভ্যুদয় হয় সেটাই – সেকুলারিজম৷ যার মূল কাজই হলো ধর্ম আর পরিবর্তনশীল সমাজকে আলাদা রাখা। তা সেটা ধর্ম বিরোধিতা করে নয় কিংবা ধর্মকে নষ্ট করাও নয়। সেকুলারিজম ডাজনট কেয়ার আস্তিক বা নাস্তিক৷ আর ঘটনা প্রবাহে আমরা ধরে নিয়েছি সেকুলারিজম এর কাজ ‘এক নং’কে ধংশ করা। এই বিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই আমরা সব সময় চিন্তা ভাবনা করি। তাই সেখানে নিরপেক্ষতার কোন বালাই থাকে না। হয়তো আমরা প্রগ্রেস চাই না। বরং থাকতে চাই কলহে। তাই ঘৃণা করি ভিন্ন যে কোন মতধারা। এডাপ্টেশনে অনীহা।  

নিজস্ব আলোচনা 

আহমেদ সানি

Leave a Reply

Close Menu