দৃশ্যমান মহাবিশ্ব : স্ফেরিকাল অ্যাস্ট্রোনমি – খ গোলক এবং আকাশপটে আঁকা ছবি

আকাশ আমাদের দৃষ্টিকে বিভিন্ন ভাবে বিভ্রান্ত করে আসছে, সেই প্রাচীন কাল থেকে। আকাশের দিকে তাকালে আমাদের মনে হয় কোন স্ফটিকের অংশবিশেষ যেন ঘিরে রেখেছে সমগ্র ভু পৃষ্ঠকে; বৃহৎ অর্থে সমগ্র পৃথিবীকে। চুমকির মতো গোলকটিতে লেগে আছে জ্যোতিষ্করা। সাদামাটা দৃষ্টিতে দেখলে মনে হয় গোলকটি সূর্য, চাঁদ, গ্রহ, তারা নিয়ে পুব থেকে ঘুরছে পশ্চিমে। যার ফলশ্রুতিতে পাচ্ছি দিন-রাত; সন্ধ্যা বা সকালের মতো প্রতিদিনকার ঘটনা গুলো। যদিও আমরা জানি এ ধরণের কোন গোলক বলে কিছু নেই। তারা সূর্য চাঁদ সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে দূর থেকে বহু দূরে। আর আকাশ গোলক বলে কোন কিছু ঘোরে না পৃথিবীকে ঘিরে। বরং পৃথিবীই ঘুরে নিজ অক্ষের উপরে। আবার ঘুরে তা সূর্যকে ঘিরে; নিজস্ব কক্ষপথ অনুসরণ করে। আর এই আপাত মনে হওয়া আকাশ গোলকের গালভরা নাম, খ-গোলক; ইংরেজিতে Celestial Sphere ।

ছবি 1 : আকাশ গোলক (Celestial Sphere) – যা আমাদের ঘিরে রেখেছে উপর থেকে।

বাস্তবিক অর্থে খ-গোলকের কোন অস্তিত্ব না থাকলেও প্রাচীন কাল থেকে প্রচলিত এই ধারনাটিকে আমরা বাদ দেই নি; এর একটি ব্যাবহারিক দিকের জন্য। আকাশ গোলক বিবেচনা করে নিলে আমরা যখন আকাশ দেখি তখন আকাশী বস্তুদের অবস্থান গতি, চলন পথ অনুধাবন করতে পারি সহজে। পর্যবেক্ষণের হিসেব নিকেসে সুবিধা হয়।

যেমন – নিচের ছবি থেকে আমরা একটি জ্যোতিষ্কর অবস্থান আকাশ গোলকের কোঅরডিনেট ব্যবহার করে খুব সহজেই প্রকাশ করতে পারি।

ছবি 2 : অতি সাধারণ খ-গোলক স্থানাংক পদ্ধতি, Celestial Sphere কে আমরা এইভাবে স্থানাংক ব্যবস্থায় বণ্টন করি গাণিতিক হিসেব নিকেশের জন্য।

Zenith হচ্ছে সরাসরি মাথার উপরে যদি একটা রেখা কল্পনা করে টানা যায় সেটা, যা আবার ভূপৃষ্ঠ থেকে 90 ডিগ্রি কোন করে থাকে। ধরে নেই একটি নক্ষত্র জেনিথের দিকে  ভূমি থেকে 45 ডিগ্রি কোণে রয়েছে, এই কোণকে বলা হয় এল্টিচুড। আবার আমরা আরেকটি চক্রাকার রেখা যদি কল্পনা করে নিই ঠিক উত্তর দিক থেকে ঠিক ছবির মতো করে এবং প্রকাশ করি ডিগ্রি দিয়ে তাহলে যে কল্পিত জিওমেট্রিক তল তৈরি করে ভূমি বরাবর দৃষ্টিসীমার বা হরাইজনের সাপেক্ষে সেটাকে আমরা বলি Azimuth, আমাদের আগ্রহের নক্ষত্রটির জন্য ছবির এজিমুথ হবে 300 ডিগ্রির মতো। ফলশ্রুতিতে আমাদের নক্ষত্রটিকে খুঁজে পেতে – এজিমুথ = 300 ডিগ্রি ও এল্টিচুড = 45 ডিগ্রি তথ্য দুটিই যথেষ্ট।  

কিন্তু মজার ব্যপার হচ্ছে আমাদের নিখুত হিসেব নিকেশের জন্য এই এজিমুথ আর এল্টিচুড এর কোঅরডিনেট সিস্টেম ব্যবহার করলেই চলে না। আরো অনেক পদ্ধতি ও জটিল মাপদন্ড ব্যবহার করতে হয় প্রয়োজন মাফিক। জটিল জটিল হিসেব নিকেশও করতে হয়। বহুল পরিচিত কয়েকটি পদ্ধতির নাম হচ্ছে –

  • Horizontal Coordinate System
  • Equatorial Coordinate System
  • Ecliptic Coordinate System
  • Ecliptic Coordinate System
  • Supergalactic Coordinate System

আবার, আমাদের এই কাল্পনিক স্ফিয়ারে বা রাতের পরিষ্কার জ্যোতিষ্ক ও তারা ভরা আকাশের পানে এলোমেলো অসংখ্য আলোক বিন্দুর মাঝে তাকিয়ে আনমনা হলে বিভিন্ন ধরণের ছবি কল্পনায় ভেসে আসে। এই ছবি দেখা আমাদের একটি স্বভাবজাত মস্তিষ্ক প্রসূত বৈশিষ্ট্য। আকাশে ভেসে বেড়ানো মেঘের মাঝে যেমন  দেখি বাড়ি ঘর, ঘোড়া, নদী, পাহাড়; সব কল্পিত; কল্পনায়।  তেমনি নক্ষত্রদের ছবি দেখা হচ্ছে একই ধরনের কল্পনা।  প্রাচীন মানুষেরা কত শত কিছু যে এই নক্ষত্রমালা দিয়ে কল্পনা করেছে তার কোন ঠিক-ঠিকানা নেই। তাদের কল্পনায় মূলত আসতো শিকারি পুরুষ (যেমন কালপুরুষ বা অরাইওন), কল্পিত দেব দেবী অথবা পৌরাণিক গল্পের কোন চরিত্র।  সে সময়কার সেই কল্পনার ছবি গুলো এখনো প্রচলিত। গল্প গাথা গুলো এখনো জনপ্রিয়। এই ছবি গুলোর সাধারণ নাম নক্ষত্র চিত্র বা তারা মণ্ডল বা তারা চিত্র অথবা Constellation। নক্ষত্রমণ্ডল গুলো দেখলে মনে হয় আকাশের ওই গোলকের গায়ে আটকানো – ছবি, আসলে কিন্তু তা নয়। একেক ছবির আকেকটি নক্ষত্র পৃথিবী থেকে একেক ধরণের দূরত্বে আছে। এটাও আমাদের চোখের আরেকটা দূরত্ব বিষয়ক বিভ্রান্তিকর উপস্থাপনার জন্য হয়। ব্যপারটির ব্যখ্যা নিচের ছবি ত্রয়ে স্পষ্ট করা হয়েছে।

ছবি 3 : মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য; Pattern Recognision করা। এর অর্থ যে কোন বিমূর্ত কাঠামোতে একটি আকৃতির কল্পনা। এই জন্যই আকাশের তারাদের মাঝে আমরা ছবি দেখি। ছবির এই প্রাচীন যোদ্ধা কাঠামোটিও তেমনি একটি ছবি। ওরাইয়ন বা কালপুরুষ নামে যা আমাদের নিকট বেশ জনপ্রিয়। আমরা ছবিটির উপরের ডানে দেখি জ্যোতিষ্কদের নাম। যা কল্পনার রেখা টেনে টেনে বায়ের ছবিটির মতো ওরাইয়নকে কল্পনা করা হয়েছে। আর এই কালপুরুষ মণ্ডলটিতে অবস্থিত জ্যোতিষ্ক গুলো আবার পৃথিবী থেকে বিভিন্ন দূরুত্বে আছে। যা দেখা যাচ্ছে নিচের ছবিতে।

সম্পূরক তথ্য, Spherical Astronomy নামের জ্যোতির্বিজ্ঞানেরই একটা অংশ রয়েছে। স্ফেরিকাল স্ফিয়ারের জ্যামিতি, বিভিন্ন অবস্থার সাপেক্ষে নক্ষত্রদের অবস্থান, আকাশ গোলকে চলন, গতি ইত্যাদি বিষয়াদি নিয়ে স্ফেরিকাল অ্যাস্ট্রোনমি। সহজ ভাষায় বললে পৃথিবী থেকে মহাকাশ দেখার কলাকৌশল সব কিছুর একছত্র অধিকার স্ফেরিকাল অ্যাস্ট্রোনমির। 

Leave a Reply

Close Menu