দৃশ্যমান মহাবিশ্ব : সৌরজগৎ, পৃথিবীর সহযাত্রী এবং তাদের উপযাত্রী গণ

আবার আকাশ গোলকের কাছে ফিরে যাই। গোলক বা আকাশের দিকে তাকালে মনে হবে সব নক্ষত্র চিত্র যেন স্থির হয়ে গোলকের গায়ে লেগে আছে, অন্য দিকে সূর্য চন্দ্র ভ্রমন করে বেরাচ্ছে নক্ষত্র চিত্র বা মণ্ডল গুলোর উপর দিয়ে। আরেকটু খেয়াল করলে দেখা যাবে নক্ষত্র চিত্রর উপর দিয়ে শুধু চন্দ্র সূর্য নয়, আরও পাঁচটি জ্যোতিষ্ক ভ্রমন করে ফিরছে। দেখতে নক্ষত্র দের মতো ক্ষুদ্র। এদের পটে কল্পনা করা আপাত দৃশ্যমান স্থির নক্ষত্র চিত্রের মাঝে আটকে নেই। যদিও দেখতে চাঁদ সূর্যের মতো বড় নয়, তবুও এরাও ভ্রমণ করে ফিরছে আকাশ দিয়ে। এদের নাম নাম; বুধ, শুক্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি। এরা আসলে গ্রহ বা প্ল্যানেট (Planet)। প্ল্যানেট শব্দটির আক্ষরিক অর্থ ভ্রমণকারী। পৃথিবীও একটি গ্রহ। এরা সবাই সূর্য কে কেন্দ্র করে ঘুরছে। সে অনুযায়ী গ্রহ সংখ্যা ছয়, পৃথিবীকে নিয়ে। কিন্তু আসলে সূর্য কে ঘিরে ঘোরা গ্রহের সংখ্যা আঁট। আর দুটি হল নেপচুন এবং ইউরেনাস। খালি চোখে এদের দেখা যায় না। দেখতে হয় যন্ত্রপাতি ব্যাবহার করে। প্রায় প্রতি গ্রহকে ঘিরেই আবার ঘুরছে এক বা একাধিক উপগ্রহ। যেমন, চাঁদ উপগ্রহটি ঘুরছে আমাদের গ্রহ পৃথিবীকে ঘিরে। মজার ব্যপার হচ্ছে – গ্রহ ছাড়াও আরো ছোটবড় অনেক কিছু ও বস্তুই সূর্যকে ঘিরে ঘুরছে। কিন্তু কোন গুলো আমাদের সূর্যকে ঘিরে ঘোরা গ্রহ সেটা নির্ধারণের জন্য আমরা International Astronomical Union সংগঠন প্রণীত তিনটি কন্ডিশন ফলো করে থাকি। ইংরেজিতে কন্ডিশনগুলো হল –

  1. A Planet orbits sun
  2. It is massive enough that its own gravity has caused its shape to be approximately spherical.
  3. It has ‘cleared the neighborhood’ around its orbit of other bodies.

তারপরে, আমরা আমাদের সৌরজগতের গ্রহ গুলোকে দুইটি পৃথক পদ্ধতিতে আলাদা করে থাকি। যারা আবার আলাদা আলাদা ভাবে দুই ভাবে বিভক্ত।

প্রথম পদ্ধতি অনুসারে –

এক। Terrestrial বা Rocky গ্রহ অর্থাৎ যাদের পৃষ্ঠ শক্ত। যেমন – পৃথিবী, মংগল, শুক্র।

দুই। Gas giant গ্রহ অর্থাৎ এই গ্রহদের পৃষ্ঠ এখনো শক্ত হয়নি বা গ্যাসীয় পর্যায়ে রয়েছে, যেমন বৃহস্পতি, শনি। বড় গ্রহ গুলো সাধারণত গ্যাসীয়াস হয়।  

দ্বিতীয় পদ্ধতি অনুসারে – 

এক। Noble or Giant Planets, এরা যারা মাঝারি থেকে বেশ বড়সর হয়। পৃথিবীও এদের মাঝে পরে। 

দুই। Dwarf Planets, এরা বেশ ছোট। জনপ্রিয় উদাহরণ হচ্ছে প্লুটো। যাকে এক সময় নোবেল গ্রহ মনে করা হতো।

মনে রাখতে হবে প্রতিটি গ্রহই বলা যায় এক ধরণের আইসোলেট আর বেশ দূরুত্ব বজায় রেখে সূর্যকে কেন্দ্র করে প্রায় বৃত্তাকারের মতো পথে একই অনুমিত তলে ঘুরছে।

ছবি 9 : ২০০২ সালের এপ্রিলের একটি ছবি যেখানে ছয়টি গ্রহকে একলাইনে দেখা যাচ্ছে  আমাদের গ্রহ পৃথিবী থেকে। 

এবার গ্রহ বাদে সূর্যকে ঘিরে ঘুরা বস্তুদের দিকে ফিরা যাক, শুরুতে –  অ্যাস্টেরয়েড বা গ্রহাণু। ধারণা করা হয় অ্যাস্টেরয়েডগুলো হচ্ছে কোন ভেঙ্গে যাওয়া গ্রহের অবশিষ্ট টুকরা টাকরি। মঙ্গল আর বৃহস্পতির মাঝামাঝি অঞ্চলে এদের দেখে মনে হয় এরা যেন বলয় তৈরি করে রেখেছে। একে বলে গ্রহাণুপুঞ্জ, ইংরেজিতে Asteroid belt ।

আমাদের দেখা এস্ট্রয়েড গুলো প্রধানত তিন টাইপের বা তিন ধরণের এলিমেন্ট সম্বৃদ্ধ। সামগ্রিক বিচারে 75% এস্ট্রয়েড হলো carbonaceous সম্বৃদ্ধ তথা C-type, 17% এস্ট্রয়েড Silicaceous বা S- type, বাকি গুলো metallic বা M- type।

এস্ট্ররয়েডের পরে উল্লেখযোগ্য যে নাম নিতে হয় তা হলো ধুমকেতু। 

ধুমকেতুদের একরকম উদ্বায়ী পদার্থের বরফ খণ্ডের মত বিবেচনা করা যেতে পারে। সূর্যের কাছাকাছি চলে আসলে সৌর রেডিয়েশনের কারনে গলে গিয়ে সূর্যের বিপরীত দিকে লম্বা, ক্ষীণ গ্যাসীয় লেজের সৃষ্টি করে। সূর্যকে কেন্দ্র করে এদের ঘুর্নয়ণ পথ তিন রকম হয় – Parabolic, Elliptic, এবং Hyperbolic। এই পথের উপরে ভিত্তি করে আমরা তিন রকম ক্লাসিফিকেশন করি। আবার, পৃথিবী থেকে দেখা যাওয়ার ভিত্তিতেও আমরা ক্লাসিফিকেশন দাড়া করিয়েছি। 

যেমন,
১। Periodic comets বা যে ধুমকেতু গুলো প্রিয়ড বা নির্দিষ্ট কাল অন্তর অন্তর পৃথিবীর আকাশে দেয়া যায়। এদের আবার তিন ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়।
-Short period comets, যাদের সাধারণত 20 বছর পরপর দেখা যায়।
-Medium period comets, ২০ থেকে ২০০ বছরের মাঝে যে ধুমকেতু বারবার ফিরে আসে সেটা মিডিয়াম পিরিয়ড কমেট।
-Long period comets, বা দুইশ বছরের অধিক বছর বছর পরে যারা ফিরে আসে তারা লং পিরিয়ড কমেন্ট।

2.Nonperiodic comets বা যে ধুমকেতু একবারই হয়তো পৃথিবীর আকাসে দেখা যায় কিন্তু ফিরে আর আসে না বা এতোই দূরে চলে যায় যে আসার সম্ভাবনা থাকে না তখন তাদের আমরা নন-প্রিয়ডিক কমেট ক্যাটাগরিতে ফেলি। 

ছবি 10 : ২০২০ সালের জুলাইয়ে দেখা যায় Neowise নামের ধুমকেতুটি। যার কেন্দ্র সবুজাভ। 

সূর্যকে ঘিরে ঘুরে চলা এই সৌরজগতের শেষ দিকে রয়েছে ছড়ানো ছিটানো আবর্জনার মত বিক্ষিপ্ত হরেক পদের পদার্থ। এরা যেন বেষ্টন করে রেখেছে সৌরজগতকে। দুটি বেষ্টনি আছে একটার নাম Oort Cloud বা উরটের মেঘ অন্যটার নাম ‘কুইপার বেল্ট’ বা Kuiper Belt । ধুমকেতুরা সাধারণত কুইপার বেল্ট আর উরটের মেঘ থেকে ছুটে আসা বস্তু পদার্থ। ভিন্ন ভাবে বলা যায় ধুমকেতুর উৎপত্তি স্থল উরটের মেঘ আর কুইপার বেল্ট।

ছবি 11 : সৌরজগত একই তলে রয়েছে বিবেচনায় নিয়ে উপর থেকে দেখলে এমনটা দেখা যাবে। 10 AU দিয়ে ওই অঞ্চলটুকুর দুরুত্ব বোঝানো হয়েছে যেন পুরো সৌর জগতের দূরত্বটা সম্পর্কে আমাদের একটি স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়। 

আরেকটু বলে রাখা ভাল সৌরজগতের কোনকিছুই সাজানো গোছানো নয়, সুশৃঙ্খল নয় বরং এলোমেলো। মারাত্মক রকমের এলোমেলো। সবকিছু ঘুরছে আর ছুটছে। এটা ওটার সাথে সংঘর্ষ হচ্ছে। হয় ধুমকেতু বা গ্রহাণু আছড়ে পড়ছে কোন না কোন গ্রহে, নয়তো সংঘর্ষ হচ্ছে নিজেদের মধ্যেই। আমাদের পৃথিবীতেও অনেক সময় অনেক কিছু ছুটে আসছে। তবে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল থাকায় এর সাথে ঘর্ষণের ফলে প্রায় সবই জ্বলে যায়। এরকম কিছু রাতের আকাশে আলোর ঝলক দেখা যায়। মনে হয় নক্ষত্র খসে পড়ছে। আসলে কোন কিছু তখন বায়ুমণ্ডলের সাথে ঘর্ষণে জ্বলে যাচ্ছে। এরকম কিছু রাতের আকাশে জ্বলতে দেখলে মনে হয় আকাশ নামক কাল্পনিক স্ফটিকের গোলকটি থেকে যেন কোন নক্ষত্র খসে পরছে। এদের বলে উল্কা বা Meteor । ঝাক ধরে যখন বেশ অনেক গুলো উল্কা জ্বলে উঠে তখন তাদের আমরা বলি উল্কাপাত তথা Meteor Shower। অনেক বড় কিছু হলে সেটা নাও জ্বলে নিঃশেষ হতে পারে। জ্বলে শেষ হয়ার আগেই আছড়ে পরতে পারে পৃথিবী পৃষ্ঠে; সৃষ্টির কারণ হতে পারে ধ্বংসাত্মক কোন ঘটনার। অতীতে এমন অনেক বার ঘটেছিলো। প্রায়শই ধ্বংসাত্মক এই রকম ঘটনা পৃথিবীর বৈচিত্রতাই পাল্টে দিয়েছে। যেমন মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীর বুকে ছুটে চলা ডাইনোসরেরা বিলুপ্ত হয়েছে যে সব কারণে তার শুরুটা শুরু হয় এমন কোন মহাজাগতিক বস্তুর পৃথিবীতে আঁচরে পরার মধ্য দিয়ে। এরকম কিছু যে আবার আঁচরে পরবে না তার নিশ্চতাও নেই।

সৌরজগত নিয়ে কিছু সাংখ্যিক তথ্য চট করে দেখে নেয়া যেতে পারে। যেখানে নেগেটিভ চিহ্ন দিয়ে রোটেসন বা ঘুর্ণয়নের উল্টো দিক বুঝানো হয়েছে। 

Leave a Reply

Close Menu